প্রিন্ট এর তারিখ : ১৪ অক্টোবর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ০৫ অক্টোবর ২০২৬
মানুষের স্বস্তিই হোক রাষ্ট্র পরিচালনার প্রধান মাপকাঠি
ফোরকানুল হক সাকিব , [ সম্পাদক ও প্রকাশক ] ||
বাংলাদেশ এখন পরিবর্তনের এক গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে। রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর রাষ্ট্র পরিচালনায় নতুন প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। কিন্তু সাধারণ মানুষের কাছে পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় অর্থ রাজনৈতিক বক্তব্য নয়—জীবনযাত্রায় স্বস্তি, নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান, ন্যায়বিচার এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে আস্থা।রাষ্ট্রের সাফল্য শেষ পর্যন্ত পরিমাপ হয় মানুষের দৈনন্দিন জীবনে। বাজারে পণ্যের দাম, পরিবারের আয়-ব্যয়ের হিসাব, তরুণের কর্মসংস্থান, ব্যবসায়ীর বিনিয়োগের পরিবেশ, নাগরিকের নিরাপত্তা এবং অসুস্থ হলে চিকিৎসা পাওয়ার নিশ্চয়তা—এসবই রাষ্ট্র পরিচালনার বাস্তব পরীক্ষা।মূল্যস্ফীতি কমলেও স্বস্তি কোথায়?বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ অক্টোবর-ডিসেম্বর প্রান্তিকের মুদ্রানীতি অনুযায়ী, ২০২৬ সালের আগস্টে সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ২৬ শতাংশে নেমেছে। খাদ্য মূল্যস্ফীতিও ৭ দশমিক ২ শতাংশে নেমেছে; তবে খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ৩২ শতাংশ। একই সঙ্গে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি ও নতুন বেতন কাঠামোর আংশিক বাস্তবায়ন ভবিষ্যতে মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন চাপ তৈরি করতে পারে বলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সতর্ক করেছে।পরিসংখ্যানের এই পরিবর্তন অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু একজন সাধারণ পরিবারের কাছে প্রশ্নটি আরও সরল—মাস শেষে আয় দিয়ে সংসার চালানো কি সহজ হচ্ছে?তাই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি সরবরাহব্যবস্থা, বাজার তদারকি, পরিবহন ব্যয় এবং কর্মসংস্থানের দিকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। শুধু মূল্যস্ফীতির হার কমলেই মানুষের স্বস্তি ফিরবে না; মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা বাড়ানোও জরুরি।অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতার পাশাপাশি দরকার আস্থাবাংলাদেশের অর্থনীতি এখনও নানা চাপের মধ্যে রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহের প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশে নেমেছে এবং জুনে ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণের অনুপাত ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশে পৌঁছেছিল।অন্যদিকে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক ২০২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ৪ শতাংশে নামিয়েছে।এসব তথ্য অর্থনীতির সামনে থাকা চ্যালেঞ্জের ইঙ্গিত দেয়। ব্যবসায়ীরা বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেন আস্থা, নীতি-স্থিতিশীলতা ও ভবিষ্যৎ বাজারের হিসাব করে। তাই ব্যাংক খাত সংস্কার, খেলাপি ঋণ আদায়, বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নয়ন এবং সরকারি অর্থের দক্ষ ব্যবহারে দৃশ্যমান অগ্রগতি প্রয়োজন।আইনশৃঙ্খলা: নাগরিকের নিরাপত্তা সবার আগেআইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা রয়েছে। সরকারও সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও মাদক নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বিত তৎপরতা জোরদারের কথা জানিয়েছে। ১ অক্টোবর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, আনুষ্ঠানিক কোনো ‘যৌথ অভিযান’-এর সিদ্ধান্ত হয়নি; সংশ্লিষ্ট বাহিনীগুলোর সমন্বিত কার্যক্রম নিয়মিত আইন প্রয়োগের অংশ হিসেবে চলছে।এখানে মূল বিষয় হওয়া উচিত একটি—আইনের প্রয়োগ যেন নিরপেক্ষ, প্রমাণভিত্তিক ও জবাবদিহিমূলক হয়।অপরাধী যে পরিচয়েরই হোক, তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। একইভাবে কোনো নিরপরাধ ব্যক্তি যেন রাজনৈতিক পরিচয়, সামাজিক পরিচয় বা অন্য কোনো কারণে হয়রানির শিকার না হন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষার সবচেয়ে শক্তিশালী ভিত্তি হলো জনগণের আস্থা।ডেঙ্গু: এটি শুধু স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সমস্যা নয়এবারের ডেঙ্গু পরিস্থিতি বিশেষ উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। রয়টার্সের ১ অক্টোবরের প্রতিবেদনে স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের তথ্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে ডেঙ্গুতে ১৪৮ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং বছরজুড়ে মৃত্যু দাঁড়িয়েছে অন্তত ২৪৫ জনে; হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৭৯ হাজার ৬২০ জন। একই প্রতিবেদনে অক্টোবরে সংক্রমণ আরও বাড়ার আশঙ্কার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।ডেঙ্গু মোকাবিলায় শুধু মশা মারার ওষুধ ছিটানো যথেষ্ট নয়। পানি জমে থাকা বন্ধ করা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নত করা, হাসপাতালের প্রস্তুতি বাড়ানো এবং স্থানীয় সরকার ও নাগরিকদের সমন্বিতভাবে কাজ করা জরুরি।একটি এলাকায় মশার প্রজননস্থল তৈরি হলে তার প্রভাব শুধু ওই বাড়িতে সীমাবদ্ধ থাকে না। তাই ডেঙ্গু প্রতিরোধকে নাগরিক দায়িত্ব এবং স্থানীয় প্রশাসনের নিয়মিত কর্মসূচিতে পরিণত করা প্রয়োজন।গণমাধ্যম ও জবাবদিহিএকটি পরিবর্তনশীল রাষ্ট্রব্যবস্থায় স্বাধীন ও দায়িত্বশীল গণমাধ্যমের প্রয়োজন আরও বেশি। সংবাদমাধ্যমের কাজ কারও পক্ষে বা বিপক্ষে প্রচারণা চালানো নয়; বরং তথ্য যাচাই করা, প্রশ্ন করা এবং জনগণের সামনে বাস্তবতা তুলে ধরা।একই সঙ্গে সংবাদমাধ্যমেরও দায়িত্ব রয়েছে—গুজব, যাচাইহীন অভিযোগ ও উত্তেজনাপূর্ণ তথ্য প্রকাশ না করা। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর উচিত সমালোচনাকে শত্রুতা হিসেবে না দেখে তথ্য ও যুক্তির মাধ্যমে জবাব দেওয়া।সামনে সবচেয়ে প্রয়োজন আস্থাবাংলাদেশের সামনে এখন একসঙ্গে অনেক চ্যালেঞ্জ—অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, মূল্যস্ফীতি, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা, কর্মসংস্থান, আইনশৃঙ্খলা এবং জনস্বাস্থ্য। এগুলোর কোনোটি এক দিনে সমাধান হওয়ার নয়।কিন্তু মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনার কাজ আজ থেকেই শুরু করা সম্ভব।সুশাসন মানে শুধু নতুন নীতি ঘোষণা নয়। সুশাসন মানে নীতির বাস্তব প্রয়োগ, প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি এবং নাগরিকের অধিকার নিশ্চিত করা।বাংলাদেশের মানুষের প্রত্যাশা এখন খুব জটিল কিছু নয়—তারা নিরাপদে থাকতে চায়, সৎভাবে কাজ করে সম্মানজনকভাবে বাঁচতে চায়, সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে চায় এবং ন্যায়বিচার পেতে চায়।তাই রাষ্ট্র পরিচালনার প্রতিটি সিদ্ধান্তে একটি প্রশ্ন সামনে রাখা প্রয়োজন—এই সিদ্ধান্তে সাধারণ মানুষের জীবন কতটা সহজ, নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ হবে?রাজনীতি, অর্থনীতি কিংবা প্রশাসন—সবকিছুর শেষ মাপকাঠি হওয়া উচিত মানুষের স্বস্তি। বাংলাদেশের আগামী দিনের রাষ্ট্র পরিচালনায় সেই স্বস্তি ও আস্থাই হোক সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।সম্পাদকীয় সূত্রভিত্তি: বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ মুদ্রানীতি, ADB-এর প্রবৃদ্ধি পূর্বাভাস, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক বক্তব্য এবং ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ে সাম্প্রতিক প্রতিবেদন ব্যবহার করে সময়োপযোগী করা হয়েছে।সূত্রের উৎস:
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ ফোরকানুল হক (সাকিব), ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ সোহাগ আরেফিন
যোগাযোগঃ-০১৮২৮৯১৫৩২০, ০১৯৭৮৯১৫৩২০ ইমেইল : info@tv26news, contact@tv26news.comসম্পাদকীয় ও বানিজ্যিক কার্যালয়ঃ- আরামবাগ, মতিঝিল, ঢাকা- ১০০০।
কপিরাইট © ২০২৬ টিভি ২৬ নিউজ । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত