প্রিন্ট এর তারিখ : ১৫ অক্টোবর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১৪ অক্টোবর ২০২৬
চার বিচারকে চলছে ২১ ম্যাজিস্ট্রেট আদালত
TV 26 NEWS ডেস্ক : ||
জামালপুর সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ৪র্থ আদালতে গতকাল মঙ্গলবার মামলার হাজিরা দিতে এসেছিলেন সদর উপজেলার শাহবাজপুর গ্রামের শামীম রাজসহ ১৭ দিনমজুর। বিচারক স্বল্পতার কারণে শুনানি হয়নি, নতুন কোনো ধার্যকৃত তারিখে হাজির থাকতে বলা হয়েছে তাদের।
৩০ কিলোমিটার পথ মাড়িয়ে একই আদালতে এসেছিলেন মাদারগঞ্জ উপজেলার বালিজুরি গ্রামের আব্দুর রৌফ। আইনজীবী ফি’সহ অন্যান্য খরচ মিটিয়ে অপেক্ষায় ছিলেন মামলার শুনানির। তাঁর আইনজীবীও শুনিয়েছেন নতুন তারিখের কথা।
বকশীগঞ্জ উপজেলার চিনারচর জব্বারগঞ্জ গ্রামের এক মামলার চার বাদী সাক্ষী নিয়ে এসেছিলেন বকশীগঞ্জের সহকারী জজ আদালতে। বিচারক না থাকায় তাদেরও ফিরে যেতে হয়েছে। জমিজমার মামলা নিয়ে ছয় বছর ধরে আদালতের বারান্দায় ঘুরছেন মেলান্দহ উপজেলার রূপসীহাটা এলাকার বাসিন্দা মজিবর রহমান। গতকাল ধার্য তারিখে তিনি এসেছিলেন জামালপুরের দ্বিতীয় সহকারী জজ আদালতে। এই আদালতেও বিচারক না থাকায় শুনানি হয়নি তাঁর মামলার।
বিচারক সংকটে এভাবেই প্রতিদিন ফিরে যেতে হচ্ছে জেলার হাজারো বিচারপ্রার্থীকে। এ চিত্র জামালপুর জেলা ও দায়রা জজ আদালত এবং চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের। প্রতি কর্মদিবসেই ধার্য তারিখে আদালতে এসে দীর্ঘ সময় আদালত প্রাঙ্গণে বা বারান্দায় বসে থাকতে হয় বিচারপ্রার্থীদের। দুপুর গড়িয়ে বিকেল হলেও শুনানির সুযোগ না পেয়ে অনেকের হাতে আসে পরবর্তী তারিখ। সকাল ১০টায় আদালত শুরু হয়। বেশির ভাগ সময় আদালতের কার্যক্রম চলে সন্ধ্যা পর্যন্ত। এর পরও অনেক মামলার শুনানি গ্রহণ সম্ভব হয় না, পরবর্তী তারিখ নির্ধারণ করতে হয়।
জামালপুর জেলা ও দায়রা জজ আদালতের ভারপ্রাপ্ত প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও নাজির ছরওয়ার জাহান সিদ্দিকী জানান, জামালপুর চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে একজন চিফ জুডিশিয়াল, একজন অতিরিক্ত চিফ জুডিশিয়াল, চারজন সিনিয়র জুডিশিয়াল ও চারজন জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট– মোট ১০ জন বিচারক থাকার কথা। বর্তমানে চিফ জুডিশিয়াল ও অতিরিক্ত চিফ জুডিশিয়াল এবং দুজন সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট কর্মরত আছেন। সিনিয়র জুডিশিয়াল ও জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের ছয়টি পদ শূন্য রয়েছে। ফলে চার বিচারক দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে ১০টি বিচারিক আদালত, সাত উপজেলার সাতটি কগনিজেন্স বা আমলি আদালত এবং দ্রুত বিচার, বিশুদ্ধ খাদ্য, বন ও বিদ্যুৎ-সংক্রান্ত ২১টি আদালতের বিচার কার্যক্রম। এ ছাড়া জেলা ও দায়রা জজ আদালতে ২৪ জন বিচারক থাকার কথা। এখানেও সরিষাবাড়ী উপজেলার সিনিয়র সিভিল জজ, বকশীগঞ্জ ও ইসলামপুর উপজেলার সিভিল জজ এবং দ্বিতীয় আদালতের সিভিল জজ, পারিবারিক আদালত-১ ও পারিবারিক আদালত-২ এই ছয়টি বিচারালয়ে শূন্য রয়েছে বিচারকের পদ।
আইনজীবীরা জানান, দীর্ঘদিন ধরে বিচারক সংকট থাকায় ব্যাহত হচ্ছে আদালতের স্বাভাবিক কার্যক্রম। প্রয়োজনের তুলনায় বিচারক কম থাকায় নির্ধারিত আদালত ছাড়াও অতিরিক্ত আদালতের দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে কয়েকজন বিচারককে। এতে নির্ধারিত সময়ে সব মামলার জামিন শুনানি, চার্জ গঠন, সাক্ষ্য গ্রহণ ও মামলা নিষ্পত্তি সম্ভব হচ্ছে না। ফলে দীর্ঘ হচ্ছে বিচারপ্রক্রিয়া, বাড়ছে মামলা নিষ্পত্তিতে বিলম্বের আশঙ্কা। সরাসরি চাপ পড়ছে বিচারপ্রার্থী সাধারণ মানুষের ওপর।
সিনিয়র আইনজীবী ইউসুফ আলী বলেন, জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে বিচারপ্রার্থীরা টাকা খরচ করে নির্ধারিত দিনে আদালতে আসেন। দিনভর আদালতের বারান্দায় অপেক্ষা করেও যখন শুনানি হয় না, তখন তাদের ফিরতে হয় নিরাশ হয়ে।
আদালত সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, জামালপুর সদরসহ জেলার সাত উপজেলার প্রত্যন্ত এলাকা থেকে প্রতিদিন পাঁচ হাজারের বেশি বিচারপ্রার্থী আদালতে আসেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন বিভিন্ন মামলার বাদী-বিবাদী, সাক্ষী এবং কারাগারে থাকা স্বজনের জামিনের আবেদন নিয়ে আসা পরিবারের সদস্যরা।
আদালত প্রাঙ্গণে কথা হয় সদর উপজেলার শাহবাজপুর গ্রামের দিনমজুর শামীম রাজের সঙ্গে। তিনি বলেন, পাঁচ বছর ধরে মামলায় জড়িত
তারা ১৭ জন প্রতি মাসে আদালতে আসছেন। আদালত না বসায় বার বার তারিখ পড়ছে। ফলে একদিকে তারা দৈনিক কাজ ও মজুরি থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। অন্যদিকে প্রতি তারিখে তাদের কষ্টের টাকা খরচ হচ্ছে।
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-১ এর পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) ফজলুল হক বলেন, বিচারক সংকটে বিচারিক কার্যক্রম বিলম্বিত হচ্ছে। এতে মামলার জট বেঁধে যাচ্ছে। তাছাড়া বিচার বিলম্বিত হলে ন্যায়বিচার বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। জামালপুর জেলা ও দায়রা জজ এবং চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে শূন্য পদগুলোতে জরুরি ভিত্তিতে বিচারক নিয়োগের দাবি জানান তিনি।
জামালপুরের জেলা ও দায়রা জজ আদালতের পিপি আনিসুজ্জামান গামা বলেন, জামালপুরে অনেক মামলা বিচারাধীন। বিচারক স্বল্পতার কারণে এসব মামলার বিচারের অগ্রগতি হচ্ছে না। এতে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে বিচারপ্রার্থীদের। তিনি বলেন, আমার জানামতে, জেলা ও দায়রা জজ স্বল্পতা দ্রুত নিরসনের জন্য আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়কে অবহিত করেছেন।
জামালপুর জেলা ও দায়রা জজ আদালতের পিপি আনিসুজ্জামান গামা ও আদালতের ভারপ্রাপ্ত প্রশাসনিক কর্মকর্তা ছরওয়ার জাহান সিদ্দিকী বলেন, জেলা ও দায়রা জজ এবং চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের আওতায় জিআর, সিআর ও বিচারিক আদালত মিলে মোট ৪৫টি আদালতে বিচারকাজ পরিচালিত হয়। এসব আদালতে প্রতিদিন তিন হাজারেরও বেশি মামলা কার্যতালিকায় থাকে। বিচারক স্বল্পতার কারণে প্রায় দুই হাজার মামলার কার্যক্রম চললেও প্রায় এক হাজার মামলার নতুন তারিখ নির্ধারণ করতে হয়।
জামালপুর জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট রিশাদ রেজওয়ান বাবু বলেন, জেলা ও দায়রা জজ এবং চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের অধীন আদালতগুলোয় প্রায় ১০ মাস ধরে বিচারক সংকট চলছে। বিচারিক কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখতে শূন্য পদগুলোতে দ্রুত বিচারক পদায়ন জরুরি উল্লেখ করে তিনি বলেন, আইনজীবী সমিতির মাধ্যমে বিচারক সংকটের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে অবহিত করা হয়েছে।
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ ফোরকানুল হক (সাকিব), ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ সোহাগ আরেফিন
যোগাযোগঃ-০১৮২৮৯১৫৩২০, ০১৯৭৮৯১৫৩২০ ইমেইল : info@tv26news, contact@tv26news.comসম্পাদকীয় ও বানিজ্যিক কার্যালয়ঃ- আরামবাগ, মতিঝিল, ঢাকা- ১০০০।
কপিরাইট © ২০২৬ টিভি ২৬ নিউজ । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত