প্রিন্ট এর তারিখ : ১৫ অক্টোবর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১৫ অক্টোবর ২০২৬
সাতক্ষীরায় ধর্ম অবমাননার অভিযোগে যুবককে পিটিয়ে হত্যা, এনসিপির তীব্র নিন্দা
TV 26 NEWS ডেস্ক : ||
সাতক্ষীরার দেবহাটা উপজেলায় ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগে ওয়াহিদুজ্জামান শামীম নামের যুবককে দুই দফায় গণপিটুনি দিয়ে হত্যার ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)।
বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) দলের দফতর সেলের সদস্য সাদিয়া ফারজানা দিনার সই করা বিজ্ঞপ্তিতে দলটি জানায় ধর্ম অবমাননার অভিযোগকে কেন্দ্র করে একজন মানুষকে প্রকাশ্যে গণপিটুনি, পুলিশ উদ্ধার করার পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় হাসপাতালে পুনরায় হামলা এবং শেষ পর্যন্ত তাকে হত্যার ঘটনা আইনের শাসন ও নাগরিকের জানমালের ওপর গুরুতর আঘাত। কোনও অভিযোগের বিচার করার অধিকার কোনও গোষ্ঠীর নেই। বিচার করার দায়িত্ব রাষ্ট্র ও আইনানুগ বিচারব্যবস্থার।
এনসিপির বিবৃতিতে বলা হয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গত ১৩ অক্টোবর দেবহাটায় যুবক শামীমের বিরুদ্ধে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগ সংবলিত অডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর এলাকায় উত্তেজনা তৈরি হয়। একপর্যায়ে তাকে মারধর করা হলে পুলিশ ৯৯৯-এ পাওয়া খবরের ভিত্তিতে উদ্ধার করে দেবহাটা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করে। কিন্তু রাতের দিকে কতিপয় লোক হাসপাতালে প্রবেশ করে চিকিৎসাধীন শামীমের ওপর আবারও হামলা চালায়। হামলার ঘটনায় সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন কারী ফজলুল হক আমিনী নামক এক ব্যক্তি। তাকে সহযোগিতা করেন স্থানীয় যুবদল কর্মী সাদিকুল ইসলাম এবং সরকারি খান বাহাদুর আহসান উল্লাহ কলেজ ছাত্রদলের আহবায়ক মোহাম্মদ নাজমুল।
পুলিশ ও হাসপাতাল কর্মীদের বাধা সত্ত্বেও শামীমকে মারধর করা হয় বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পরে গুরুতর অবস্থায় চিকিৎসা নিতে গেলে দ্বিতীয় দফা গণপিটুনিতে তিনি নিহত হন।
এনসিপির অভিযোগ ঘটনাটির সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো, প্রথম দফায় পুলিশ তাকে উদ্ধার করে চিকিৎসার ব্যবস্থা করার পরও তার জীবনের নিরাপত্তা পর্যাপ্ত নিশ্চিত করেনি। হাসপাতাল যদি একজন আহত মানুষের জন্যও নিরাপদ আশ্রয় না থাকে, তাহলে সাধারণ নাগরিকের নিরাপত্তা কোথায়? শত শত মানুষের ভিড় কীভাবে হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা ব্যাহত করে একজন চিকিৎসাধীন ব্যক্তির ওপর দ্বিতীয় দফায় হামলার সুযোগ পেল—এ প্রশ্নের জবাব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে দিতে হবে। শুধু ঘটনার পর স্রেফ তদন্তের ফাঁকা ঘোষণা নয়, হামলা প্রতিরোধে ব্যর্থতার কারণও খতিয়ে দেখতে হবে।
এনসিপি স্পষ্টভাবে বলতে চায়, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগ গুরুতর হলে যথাযথ তদন্তপূর্বক সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির আইনানুগ বিচার হতে পারে। কিন্তু অভিযোগের সত্যতা যাচাই, বক্তব্যের প্রেক্ষাপট নির্ধারণ এবং অভিযুক্তের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়ার আগেই কাউকে শাস্তি দেওয়ার নামে পিটিয়ে হত্যা করা কোনো ভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধা প্রতিষ্ঠার নামে আইন ভাঙা, হত্যা সংঘটিত করা কিংবা বিচারব্যবস্থাকে অকার্যকর করে দেওয়ার অধিকার কারও নেই। উপরন্তু এটি পবিত্র ইসলাম ধর্মের মূলগত মর্মবিরোধী কর্মকাণ্ড। সব প্রাণের নিরাপত্তা ও হক আদায় ইসলামের মৌলিক শিক্ষা। ধর্মীয় অনুভূতির সুরক্ষা এবং মানুষের জীবন ও আইনি অধিকার রক্ষা—দুটিই রাষ্ট্রের দায়িত্ব; আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে বিচার করবার অধিকার কারোর নেই।
এনসিপি আরও উল্লেখ করে নিহত শামীমের পরিবারের দাবি, তিনি মানসিকভাবে অসুস্থ ছিলেন এবং তার চিকিৎসা চলছিল। তার বিরুদ্ধে ছড়িয়ে পড়া অডিওর সত্যতা, বক্তব্যের প্রকৃত প্রেক্ষাপট এবং তার শারীরিক ও মানসিক অবস্থা যথাযথভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচারিত কোনও অডিও বা অভিযোগকে হত্যাকাণ্ডের লাইসেন্স হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। অভিযোগ সত্য হোক বা মিথ্যা—কোনও অবস্থাতেই গণপিটুনি দিয়ে হত্যা বৈধ হয়ে যায় না।
এনসিপি এ ঘটনায় নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলো দাবি করছে:
১. হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের শনাক্ত ও গ্রেফতার, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য, ভিডিও ফুটেজ এবং অন্যান্য প্রমাণের ভিত্তিতে প্রথম ও দ্বিতীয় দফার হামলায় অংশগ্রহণকারীদের শনাক্ত করে দ্রুত আইনের আওতায় আনতে হবে। হামলায় উসকানি, জনতাকে সংগঠিত করা কিংবা সহিংসতা সংঘটনে ভূমিকার অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট প্রত্যেকের ভূমিকা তদন্ত করতে হবে।
২. হাসপাতালে দ্বিতীয় দফার হামলার জবাবদিহি: চিকিৎসাধীন একজন ব্যক্তির ওপর হামলা ঠেকাতে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল, নিরাপত্তাব্যবস্থা কেন ব্যর্থ হলো এবং কারও দায়িত্বে অবহেলা ছিল কি না—তা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করতে হবে। দায়িত্বে অবহেলা বা যোগসাজশ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধেও আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে।
৩. সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উসকানি ও গুজবের তদন্ত: যে অডিওকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা ছড়িয়েছে, তার উৎস, সত্যতা ও প্রেক্ষাপট যাচাই করতে হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বক্তব্য প্রচার, জনতাকে জড়ো করা কিংবা সহিংসতায় উসকানি দেওয়ার অভিযোগ থাকলে প্রমাণের ভিত্তিতে আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে সাম্প্রদায়িক উস্কানি ও প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে সহিংস অপরাধ ঠেকাতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
৪. পরিবারের নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা: নিহতের পরিবারের সদস্য ও প্রত্যক্ষদর্শীরা যেন ভয়ভীতি বা প্রতিশোধের আশঙ্কা ছাড়াই বক্তব্য দিতে পারেন, তা নিশ্চিত করতে হবে। পরিবারকে আইনি সহায়তা এবং ন্যায়বিচার পাওয়ার কার্যকর সুযোগ দিতে হবে।
জাতীয় নাগরিক পার্টি মনে করে, সাম্প্রদায়িক উসকানি এবং ধর্ম অবমাননার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের অবস্থান হতে হবে দ্ব্যর্থহীন। অপরাধের অভিযোগ উঠলেই হঠাৎ সংগঠিত উত্তেজিত জনতার শাস্তি দেওয়ার ক্ষমতা ছেড়ে দিলে আইন ও বিচারব্যবস্থার অস্তিত্ব অর্থহীন হয়ে পড়ে।
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ ফোরকানুল হক (সাকিব), ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ সোহাগ আরেফিন
যোগাযোগঃ-০১৮২৮৯১৫৩২০, ০১৯৭৮৯১৫৩২০ ইমেইল : info@tv26news, contact@tv26news.comসম্পাদকীয় ও বানিজ্যিক কার্যালয়ঃ- আরামবাগ, মতিঝিল, ঢাকা- ১০০০।
কপিরাইট © ২০২৬ টিভি ২৬ নিউজ । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত