প্রিন্ট এর তারিখ : ২০ অক্টোবর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ২০ অক্টোবর ২০২৬
কখনো মুচি কখনো ফেরিওয়ালার ছদ্মবেশে অপরাধের খবর খুঁজতেন সাংবাদিক আলিফ, হত্যার নেপথ্যে কী
TV 26 NEWS ডেস্ক : ||
কখনো মুচি, কখনো ফেরিওয়ালা, আবার কখনো মানসিক ভারসাম্যহীন ব্যক্তির ছদ্মবেশে ঘুরে বেড়াতেন সীমান্ত এলাকায়। উদ্দেশ্য ছিল মাদক কারবার, চোরাচালান ও অবৈধ বালু-পাথর উত্তোলনসহ নানা অপরাধের তথ্য সংগ্রহ করা। অনুসন্ধানী সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকিরের এমন কর্মকাণ্ডের কথা জানিয়েছেন তার সহকর্মী ও স্থানীয় সূত্রগুলো। অপরাধের তথ্য প্রকাশের ঘোষণা দেওয়ার পর গুলিতে তার মৃত্যুর ঘটনায় এখন তার অনুসন্ধানের বিষয়গুলো ঘিরে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
হত্যার আগের দিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘আগামীকাল চাঞ্চল্যকর অপরাধের গডফাদারের তথ্য-প্রমাণ......’ প্রকাশের ইঙ্গিত দিয়েছিলেন আলিফ। কিন্তু সেই তথ্য আর প্রকাশ করা হয়নি। নেত্রকোনার দুর্গাপুরে তার হত্যাকাণ্ডের পর প্রশ্ন উঠেছে, তিনি ঠিক কোন অপরাধের তথ্য সামনে আনতে যাচ্ছিলেন এবং সেই অনুসন্ধানের সঙ্গে হত্যার কোনো যোগসূত্র ছিল কি না।
মাদক, চোরাচালান ও সীমান্ত এলাকার অপরাধের পাশাপাশি কলমাকান্দা উপজেলা নির্বাচন কার্যালয়কে ঘিরে রোহিঙ্গা নাগরিকদের বাংলাদেশি পরিচয়ে ভোটার নিবন্ধন ও জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) তৈরির অভিযোগও আলোচনায় এসেছে। তবে এসব ঘটনা ও আলিফ হত্যাকাণ্ডের মধ্যে সরাসরি কোনো সম্পর্ক এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি। সংশ্লিষ্ট অভিযোগগুলোর সত্যতা এবং হত্যার সঙ্গে সম্ভাব্য যোগসূত্র তদন্তের মাধ্যমেই নিশ্চিত হওয়া সম্ভব।
আগেও হামলার শিকার হয়েছিলেন আলিফপরিবারের সদস্য ও সহকর্মীদের দাবি, অপরাধ নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন তৈরির কারণে আগেও হামলার শিকার হয়েছিলেন আলিফ। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত বছরের জানুয়ারিতে দুর্গাপুর পৌর শহরের উকিলপাড়া এলাকায় এবং নভেম্বরে সোমেশ্বরী নদীর তেরিবাজার ঘাটে তার ওপর হামলার ঘটনা ঘটে।
সহকর্মীদের ভাষ্য, দুর্গাপুর ও কলমাকান্দা সীমান্ত অঞ্চলে মাদক কারবার, চোরাচালান এবং অবৈধভাবে বালু-পাথর উত্তোলনের বিষয়ে নিয়মিত খোঁজখবর রাখতেন তিনি। তথ্য সংগ্রহের জন্য কখনো মুচি, কখনো ফেরিওয়ালা, এমনকি মানসিক ভারসাম্যহীন ব্যক্তির ছদ্মবেশও ধারণ করতেন বলে স্থানীয় সূত্রগুলোর দাবি। আগের হামলার ঘটনাগুলো তার অনুসন্ধানী কাজের ঝুঁকি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
আলিফের মৃত্যুর আগে তার ‘ডিটেকটিভ আর্টিকেল’ নামের ফেসবুক পেজেও অপরাধসংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রকাশের ইঙ্গিত ছিল। সহকর্মীদের মতে, ওই পোস্টের সূত্র ধরে তার শেষ অনুসন্ধানের বিষয়বস্তু শনাক্ত করা তদন্তের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। এ ক্ষেত্রে তার ব্যবহৃত মুঠোফোন, কললিস্ট, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বার্তা, সংরক্ষিত নথি এবং অপ্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে।
রোহিঙ্গাদের এনআইডি তৈরির অভিযোগ ঘিরে প্রশ্নআলিফ হত্যার আগে কলমাকান্দা উপজেলা নির্বাচন কার্যালয়কে কেন্দ্র করে পাঁচজন রোহিঙ্গা নাগরিকের ভুয়া নাম-ঠিকানা ব্যবহার করে ভোটার নিবন্ধন ও এনআইডি তৈরির চেষ্টার অভিযোগ সামনে আসে। অভিযোগে বলা হয়েছে, তাদের ঠিকানা হিসেবে রংছাতি ইউনিয়নের শান্তিনগর গ্রামের নাম ব্যবহার করা হয়েছিল। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, নথিপত্র যাচাইয়ের সময় কিছু অসংগতি পাওয়া গেছে।
এর আগে একই নির্বাচন কার্যালয়ে রোহিঙ্গা নাগরিকের এনআইডি তৈরির অভিযোগে কয়েকজন কর্মীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার তথ্যও প্রকাশিত হয়েছিল। আলিফের ফেসবুক পেজে তার মৃত্যুর আগে রোহিঙ্গাদের এনআইডি ও জন্মনিবন্ধনে ভুয়া তথ্য ব্যবহারের বিষয়ে অনুসন্ধানের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সময়ে অবৈধ বালু ব্যবসা ও পাথর উত্তোলন নিয়েও পোস্ট করেছিলেন তিনি।
জাতীয় পরিচয়পত্রের অপব্যবহার শুধু ভোটার নিবন্ধনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ব্যাংক হিসাব খোলা, মুঠোফোনের সিম নিবন্ধন, পাসপোর্ট তৈরি এবং বিভিন্ন নাগরিক সেবা গ্রহণেও এটি ব্যবহৃত হয়। ফলে বিদেশি কোনো নাগরিক ভুয়া বাংলাদেশি পরিচয়ে এনআইডি পেলে তার প্রভাব আরও বিস্তৃত হতে পারে। এ কারণে অভিযোগের তদন্তে আবেদনকারীদের পাশাপাশি নথি তৈরির বিভিন্ন পর্যায়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা যাচাইয়ের প্রয়োজনীয়তার কথা বলছেন সংশ্লিষ্টরা।
মাদক মামলায় গ্রেপ্তারের পুরোনো তথ্যসীমান্ত অপরাধ ও রোহিঙ্গাদের পরিচয়সংক্রান্ত অভিযোগের আলোচনায় কয়েক বছর আগের একটি মাদক মামলার তথ্যও সামনে এসেছে।নেত্রকোনা সদরের কে-গাতি ইউনিয়নের চুয়ারকান্দা গ্রামের ইলিয়াস কাদের বাবুলের বিরুদ্ধে অতীতে মাদকসংক্রান্ত মামলা ও গ্রেপ্তারের তথ্য প্রকাশিত হয়েছিল।
২০২২ সালের মে মাসে ময়মনসিংহে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের এক অভিযানে বাবুল, তার রোহিঙ্গা স্ত্রী রোজিনা বেগমসহ সাতজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। সে সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, মাদক ব্যবসার সুবিধা নিতে বাবুল ওই নারীকে বিয়ে করেছিলেন। তার স্ত্রী ও আত্মীয়দের মাধ্যমে টেকনাফ থেকে ইয়াবা এনে ময়মনসিংহে সরবরাহ করা হতো বলেও অভিযোগ করা হয়েছিল।
বর্তমানে বাবুলকে ঘিরে যেসব অভিযোগ আলোচনায় রয়েছে, তার মধ্যে রোহিঙ্গা স্ত্রী ও তার আত্মীয়দের মাধ্যমে মাদক ব্যবসা এবং স্থানীয় পরিচয় ব্যবহার করে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশি পরিচয়পত্র তৈরির চেষ্টার অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের সঙ্গে আলিফ হত্যার সম্পর্ক আছে কি না, তা এখনো প্রমাণিত নয়।
হত্যার পরিকল্পনায় কারা, তদন্তে সেই প্রশ্নআলিফ হত্যার ঘটনায় মাঠপর্যায়ের হামলাকারী হিসেবে সন্দেহভাজন একজনকে গ্রেপ্তারের পর তদন্তের পরিধি নিয়ে নতুন করে আলোচনা হচ্ছে। সহকর্মীদের মতে, শুধু সরাসরি হামলাকারীকে শনাক্ত করাই যথেষ্ট নয়; হত্যার পরিকল্পনা, নির্দেশদাতা, অর্থের জোগান এবং ঘটনার আগে-পরে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকার বিষয়টিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
পুলিশ ঘটনাটিকে পরিকল্পিত টার্গেট কিলিং হিসেবে দেখছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। আলিফের সহকর্মীরা বলছেন, তার শেষ অনুসন্ধান, আগে হামলার শিকার হওয়ার ঘটনা এবং হত্যার আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া পোস্টগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিশ্লেষণ করা দরকার।
তাদের মতে, আলিফ কোন তথ্য প্রকাশ করতে যাচ্ছিলেন, তার অনুসন্ধানের সঙ্গে কারা যুক্ত ছিলেন, আগের হামলার সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না এবং রোহিঙ্গাদের এনআইডি তৈরির অভিযোগ, মাদক সরবরাহ ও সীমান্ত অপরাধের মধ্যে কোনো যোগসূত্র আছে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে। এ জন্য তার ডিজিটাল ডিভাইস, ব্যক্তিগত নোট, প্রকাশিত ও অপ্রকাশিত প্রতিবেদন এবং মৃত্যুর আগের কয়েক দিনের যোগাযোগের তথ্য পরীক্ষা করার দাবি জানিয়েছেন সহকর্মীরা।
গ্রেপ্তার আসামির এক দিনের রিমান্ডএদিকে সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান ফকির আলিফ হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার সাজিবুল ইসলাম ওরফে অপূর্বর এক দিনের পুলিশ রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। সোমবার (১৯ অক্টোবর) দুপুরে দুর্গাপুর চৌকি আদালতের জ্যেষ্ঠ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট নুরুল আমিন ভূঁইয়া এ আদেশ দেন। এর আগে আসামিকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সাত দিনের রিমান্ড চেয়েছিল পুলিশ। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও দুর্গাপুর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আসাদুল ইসলাম বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
গত বৃহস্পতিবার রাত সোয়া ৮টার দিকে দুর্গাপুর উপজেলার বিরিশিরি ইউনিয়নের তেলুনজিয়া এলাকায় শ্বশুরবাড়ির কাছের একটি দোকানের সামনে গুলিবিদ্ধ হন আলিফ। পরে তার মৃত্যু হয়। ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসকের ভাষ্য অনুযায়ী, তার শরীরে ছয়টি গুলির আঘাত ছিল।
ঘটনার পর শনিবার দিবাগত রাত ১টার দিকে দুর্গাপুর পৌর শহরের মধ্যবাজার এলাকার পুরোনো সিনেমা হলের পাশ থেকে সাজিবুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তিনি পৌর শহরের উকিলপাড়া এলাকার শমশের আলীর ছেলে। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে দুর্গাপুরে পুলিশের উপপরিদর্শক শফিকুল ইসলাম হত্যা মামলাতেও তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল।
দুর্গাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খন্দকার শাকের আহমদ বলেন, সাংবাদিক আলিফ হত্যার কারণ উদ্ঘাটন এবং ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে তদন্ত চলছে।
আলিফের মৃত্যুর পর তার পরিবার দুই ছোট সন্তানকে নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে। অন্যদিকে সহকর্মীরা অপেক্ষা করছেন, তার শেষ অনুসন্ধানের বিষয়বস্তু এবং হত্যার পেছনের কারণ তদন্তে স্পষ্ট হবে। তাদের প্রত্যাশা, হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করার পাশাপাশি এর নেপথ্যে কোনো অপরাধচক্র বা পরিকল্পনা ছিল কি না, সেটিও উদ্ঘাটন করা হবে।
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ ফোরকানুল হক (সাকিব), ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ সোহাগ আরেফিন
যোগাযোগঃ-০১৮২৮৯১৫৩২০, ০১৯৭৮৯১৫৩২০ ইমেইল : info@tv26news, contact@tv26news.comসম্পাদকীয় ও বানিজ্যিক কার্যালয়ঃ- আরামবাগ, মতিঝিল, ঢাকা- ১০০০।
কপিরাইট © ২০২৬ টিভি ২৬ নিউজ । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত