প্রিন্ট এর তারিখ : ০৮ নভেম্বর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ০৭ নভেম্বর ২০২৬
দখলদারদের কবলে ফেনীর রাজাঝির দিঘি, পাড়জুড়ে ৫০০ অবৈধ দোকান
TV 26 NEWS ডেস্ক : ||
ফেনী শহরের ঐতিহ্য, ইতিহাস ও নাগরিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ রাজাঝির দিঘি। একসময় নির্মল জলরাশি, খোলা বাতাস আর নয়নাভিরাম পরিবেশের জন্য পরিচিত এই দিঘি এখন দখলদারদের বাণিজ্যকেন্দ্র। দিঘির পাড় ঘিরে গড়ে উঠেছে পাঁচ শতাধিক অবৈধ দোকান।
এসব দোকানের দখলে সংকুচিত হয়েছে চলাচলের পথ, বাধাগ্রস্ত হচ্ছে ওয়াকওয়ে ব্যবহার। দোকানের বর্জ্য ও আবর্জনা পড়ছে দিঘির পানিতে। ফলে একদিকে হারাচ্ছে ঐতিহাসিক জলাধারের সৌন্দর্য, অন্যদিকে বাড়ছে পরিবেশদূষণ ও নাগরিক ভোগান্তি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে প্রভাবশালী মহলের নিয়ন্ত্রণে চলছে এই অবৈধ বাণিজ্য। দোকান বসানো থেকে শুরু করে মাসিক টাকা আদায়, সবকিছুতেই রয়েছে অদৃশ্য নিয়ন্ত্রণ। অথচ সরকারি জায়গায় এসব স্থাপনা গড়ে উঠলেও কার্যকর ব্যবস্থা নিতে দেখা যাচ্ছে না।
ফেনী শহরের প্রাণকেন্দ্র ট্রাংক রোডের পাশে অবস্থিত প্রায় ১০ দশমিক ৩২ একর আয়তনের রাজাঝির দিঘি। কথিত ইতিহাস অনুযায়ী, ত্রিপুরার মাণিক্য রাজবংশের এক রাজা তার অন্ধ কন্যার দৃষ্টিশক্তি ফিরে পাওয়ার আশায় দিঘিটি খনন করেন। রাজকন্যা রাজনন্দিনীর নাম অনুসারে এটি রাজনন্দিনীর দিঘি হিসেবেও পরিচিত।
কিন্তু সময়ের ব্যবধানে সেই ঐতিহ্য এখন দখলদারত্বের চাপে বিপন্ন। বিশেষ করে দক্ষিণ, পূর্ব ও পশ্চিম পাড়ে দোকানের সারি এমনভাবে বিস্তৃত হয়েছে যে পথচারীদের স্বাভাবিক চলাচল কঠিন হয়ে পড়েছে। দিঘির পূর্ব ও দক্ষিণ পাড়ে জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের অর্থায়নে ফেনী পৌরসভার নির্মিত দৃষ্টিনন্দন ওয়াকওয়েও পড়েছে দখলের প্রভাবের মুখে।
স্থানীয়রা বলছেন, দোকানপাটের আড়ালে মাদকসেবী, ইভটিজার ও কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের আনাগোনা বেড়েছে। সন্ধ্যার পর এলাকাটিতে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়। সম্প্রতি দিঘি থেকে দুটি অজ্ঞাতনামা মরদেহ উদ্ধারের ঘটনাও স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক বাড়িয়েছে।
রাজাঝির দিঘির পাড় দখলমুক্ত করতে অতীতে একাধিকবার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ২০১৬ সালের ডিসেম্বর, ২০১৭ সালের এপ্রিল ও ২০১৯ সালের মার্চে ফেনী জেলা প্রশাসন ও পৌরসভা উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করে। দোকান সরিয়ে নিতে মাইকিংও করা হয়েছিল। কিন্তু কিছুদিন যেতে না যেতেই আবার পুরোনো চেহারায় ফিরে আসে দিঘির পাড়।
ব্যবসায়ীদের একাংশের দাবি, বিকল্প কর্মসংস্থান বা পুনর্বাসনের ব্যবস্থা না করে উচ্ছেদ অভিযান চালানোয় তারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। অন্যদিকে স্থানীয়দের অভিযোগ, রাজনৈতিক প্রভাব ও আর্থিক স্বার্থের কারণে দখলদারত্ব স্থায়ীভাবে বন্ধ করা যাচ্ছে না।
ফেনী প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি রফিকুল ইসলাম বলেন, সরকারি জায়গা দখল করে বছরের পর বছর অবৈধ বাণিজ্য চলছে। অতীতে আওয়ামী লীগ নেতাদের বিরুদ্ধে এই বাণিজ্য থেকে ভাগ নেওয়ার অভিযোগ ছিল। ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ভিন্ন দল এবং প্রশাসনের কতিপয় কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অবৈধ সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। তিনি সরকারি জায়গায় গড়ে ওঠা অবৈধ দোকানে কীভাবে বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া হলো তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন।
দিঘির পাড়ে দীর্ঘদিন ধরে ব্যাবসা করে আসা কাপড় ব্যবসায়ী মোর্শেদ আলম বলেন, তার বাবা দীর্ঘদিন এখানে ব্যাবসা করেছেন। সম্প্রতি বাবার মৃত্যুর পর তিনি দোকানটি পরিচালনা করছেন। এই ব্যাবসার আয়েই তাদের সংসার চলে। তার দাবি, দিঘির পাড়ের দোকানগুলোকে কেন্দ্র করে দুই হাজারের বেশি মানুষের জীবিকা নির্ভরশীল। তাদের উচ্ছেদ করা হলে বহু পরিবার বিপাকে পড়বে। তাই উচ্ছেদের আগে পৌরসভা ও জেলা প্রশাসনের কাছে একটি হকার্স মার্কেট নির্মাণের দাবি জানান তিনি।
ফেনী পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী জাকির উদ্দিন বলেন, রাজাঝির দিঘির পাড়ে পাঁচ শতাধিক দোকান পৌরসভার অনুমোদন ছাড়াই বসানো হয়েছে। এসব দোকান থেকে পৌরসভা কোনো ভাড়া পায় না। তবে লোকমুখে শোনা যায়, প্রতিটি দোকান থেকে মাসে ৬০০ টাকা করে আদায় করা হয়। কারা এই টাকা আদায় করছে, সে বিষয়ে পৌরসভা অবগত নয়।
ফেনী শহর ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মুশফিকুর রহমান পিপুল বলেন, সরকারি জায়গা দখল করে অবৈধভাবে ব্যাবসা চলতে পারে না। তিনি অবিলম্বে দোকানগুলো উচ্ছেদ করে দিঘির প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ফিরিয়ে আনার দাবি জানান।
ফেনী জেলা বিএনপির সদস্যসচিব আলাল উদ্দিন আলাল বলেন, রাজাঝির দিঘিকে কেন্দ্র করেই আজকের ফেনী শহরের গোড়াপত্তন। অথচ ঐতিহ্যবাহী দিঘির পাড় এখন অবৈধ হকারদের দখলে। নামকাওয়াস্তে উচ্ছেদ অভিযান না চালিয়ে পরিকল্পিতভাবে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
তার প্রস্তাব, নির্দিষ্ট নীতিমালার আওতায় সন্ধ্যাকালীন বাজার চালু করা হলে একদিকে দখলমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত হবে, অন্যদিকে হকারদের পুনর্বাসন ও সরকারের রাজস্ব আয়ের সুযোগ তৈরি হবে। দলের নাম ব্যবহার করে কেউ চাঁদা আদায় করলে প্রমাণ সাপেক্ষে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
ফেনী জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মাহবুবউল করিম বলেন, রাজাঝির দিঘির পাড়ে অবৈধভাবে গড়ে ওঠা দোকানগুলো দীর্ঘদিনের সমস্যা। এ বিষয়ে জেলা পরিষদ, ফেনী পৌরসভা ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করে পরবর্তী করণীয় নির্ধারণ করা হবে।
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ ফোরকানুল হক (সাকিব), ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ সোহাগ আরেফিন
যোগাযোগঃ- +8801828-915320, +8801978-915320 ইমেইল : info@tv26news, contact@tv26news.comসম্পাদকীয় ও বানিজ্যিক কার্যালয়ঃ- আরামবাগ, মতিঝিল, ঢাকা- ১০০০।
কপিরাইট © ২০২৬ টিভি ২৬ নিউজ । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত