স্পিকারের সেই বক্তব্য নিয়ে যা বললেন তাসনিম জারা
এনসিপির সাবেক নেত্রী ডা. তাসনিম জারা বলেছেন, ভালো বা যোগ্য মানুষ দেখে রাজনৈতিক দল নমিনেশন দেওয়া হয় না। ভালো মানুষ স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসাবে দাঁড়াতে গেলেও প্রতিটা পদক্ষেপে হেনস্তা করা হয়।
‘ভালো লোকের নির্বাচনে দাঁড়ানোরই সুযোগ নেই’-জাতীয় সংসদের স্পিকারের এমন আক্ষেপের বিষয়ে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে জারা এসব কথা লিখেন। তার পোস্টটি Tv 26 News এর পাঠকদের জন্য হুবহু দেওয়া হলো।
‘আজকে স্পিকারের একটা বক্তব্য দেখলাম। তিনি বলছেন যে, ভালো লোকের নির্বাচনে দাঁড়ানোরই সুযোগ নেই।
ওনার সঙ্গে একমত। ভালো বা যোগ্য মানুষ দেখে পার্টি নমিনেশন দেয় না। আর স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসাবে দাঁড়াতে গেলে আপনাকে প্রতিটা পদক্ষেপে হেনস্থা করা হবে।
তবে আমার কথা অন্য জায়গায়। আক্ষেপ করার জন্য আমরা সাধারণ মানুষরা তো আছিই। স্পিকারের কাজ আক্ষেপ করা না, উনি তো সত্যিকারের কিছু পরিবর্তন আনতে পারেন ওনার জায়গা থেকে।
স্পিকারের বক্তব্যে মনে হয়েছে ভালো কিছু করার জন্য ওনার সদিচ্ছা আছে। তাই একটা জিনিস তুলে ধরি, যেটা উনি ওনার জায়গা থেকে করতে পারেন, আর করলে এমপিদের ভালো হয়ে থাকার বাধ্যবাধকতা বাড়বে।
আমাদের সংসদের প্রায় ৬০ শতাংশ সদস্য ব্যবসায়ী, প্রায় ৮০ শতাংশ কোটিপতি। ব্যবসা থাকা বা কোটিপতি হওয়া দোষের কিছু না। কিন্তু এই টাকা কোথা থেকে আসছে, বৈধ উপায়ে আসছে কি না, সেটা আমাদের জানা দরকার।
অনেক এমপিকেই দেখা যায়, এমপি হওয়ার পর দামি গাড়িতে চড়েন, হাতে দামি ঘড়ি, নতুন ফ্ল্যাটে থাকা শুরু করেন। জিজ্ঞেস করলে বলেন গিফট। কে দিলো, কিসের বিনিময়ে দিলো, জানার কোনো উপায় নেই। আমরা সাধারণ মানুষ, এমপিকে গাড়ি দেওয়ার সামর্থ্য আমাদের নেই। কিন্তু কোনো ব্যবসায়ী যদি এমপিকে একটা গাড়ি দেন, এমপি হয়তো তার জন্যই সংসদ গরম করবেন, সরকারি অফিসে ফোন দিবেন তাকে বিশেষ সুবিধা করে দেওয়ার জন্য। অথচ বেতন খাবেন জনগণের।
এটা থামানোর প্রথম ধাপ একটা রেজিস্টার বানানো। প্রত্যেক এমপি নিয়মিত জানাবেন তার কী সম্পদ আছে, কোন ব্যবসায় তার অংশ আছে, কার কাছ থেকে কী উপহার পেয়েছেন, কার খরচে বিদেশ গেছেন। আর সেই তথ্য অনলাইনে দেখা যাবে।
এখন আমাদের হাতে আছে শুধু নির্বাচনের আগের হলফনামা, পাঁচ বছরে একবার, আর সেটাও ঠিকমতো যাচাই হয় না। কয়েকজন এমপির বিরুদ্ধে হলফনামায় ভুল তথ্য দেয়ার অভিযোগ উঠেছে। নির্বাচন কমিশন ঘুমিয়ে আছে। জিজ্ঞেস করলে বলছে, অভিযোগ পেলে দেখবে।
আমি নতুন কিছু বলছি না। যুক্তরাজ্যে এমন রেজিস্টার আছে, যেখানে এমপিদের নিয়মিত এসব তথ্য দিতে হয়, আর সেটা কয়েক সপ্তাহ পরপর আপডেট হয়ে প্রকাশ হয়। কয়েকশো পাউন্ডের বেশি দামের উপহার, দাওয়াত বা বিদেশ সফর পেলেই লিখতে হয়। একজন এমপি এক বিদেশি সরকারের খরচে পরিবার নিয়ে দুবার ছুটি কাটিয়েছিলেন, রেজিস্টারে লেখেননি। ধরা পড়ার পর ত্রিশ দিনের জন্য সাসপেন্ড হন।
আমি বলছি না যে এমন একটা রেজিস্টার থাকলেই আমাদের সব দুর্নীতি বন্ধ হবে। কিন্তু দুর্নীতি করাটা একটু কঠিন হয়ে যাবে। এমপি নিজের হাতে লিখে দিয়েছেন কার কাছ থেকে কী পেয়েছেন। পরে যদি বেরিয়ে আসে আরও কিছু ছিলো, তখন আর ‘গিফট’ বা ‘সৌজন্য সাক্ষাৎ’ বলে পার পাওয়ার রাস্তা থাকবে না। মিথ্যাটা সহজেই প্রমাণ করা যাবে।
এখন প্রশ্ন করবেন, মাননীয় স্পিকার কী করতে পারেন? সংসদের নিয়মকানুন নিয়ে যে কমিটি, তার সভাপতি স্পিকার নিজে। তিনি সেখান থেকে নিয়ম প্রস্তাব করতে পারেন। এই তথ্য রাখা আর ওয়েবসাইটে দেয়ার কাজ সংসদ সচিবালয় দিয়েই করা যায়, যার কমিশনের চেয়ারম্যানও উনি। আর যদি বলেন ওনার হাত-পা বাঁধা, তাহলেও এই বিষয়ে সচেতনতা তৈরি করতে পারেন।
স্পিকার মুক্তিযুদ্ধে বীর বিক্রম, ভোলা থেকে বারবার নির্বাচিত এমপি, মন্ত্রী ছিলেন। লম্বা রাজনৈতিক জীবন। এখন এমন একটা চেয়ারে বসে আছেন, যেখান থেকে সত্যিকারের পরিবর্তন আনা যায়। আশা করি এই সুযোগটা উনি কাজে লাগাবেন।’