ঢাকা    বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬
ঢাকা    বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬
টিভি ২৬ নিউজ

পাকিস্তানে ধর্ষণ মামলা: প্রতিশ্রুতি পূরণ হয়নি পাঁচ বছরেও

ধর্ষণের শিকার ব্যক্তিদের দ্রুত ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে পাকিস্তানে বিশেষ আদালত গঠনসহ নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। ২০২১ সালের আইনে বিচারপ্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করার প্রতিশ্রুতিও ছিল। কিন্তু বাস্তবে মামলার দীর্ঘসূত্রতা কাটেনি। সরকারি পরিসংখ্যানে উঠে এসেছে, বিপুলসংখ্যক মামলা নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে, আর দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন তুলনামূলকভাবে অল্পসংখ্যক আসামি।  পাকিস্তানের অনুসন্ধানী সাংবাদিক রিয়াজ হকের লেখা ও ‘ডন’-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এমন তথ্য পাওয়া গেছে।   প্রতিবেদনে তুলে ধরা সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২১ সাল থেকে ২০২৬ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত পাকিস্তানের চার প্রদেশে ধর্ষণ-সংশ্লিষ্ট পাঁচ ধরনের অপরাধে মোট ৪৭ হাজার ৪৫২টি মামলা নথিভুক্ত হয়েছে। অথচ দণ্ডিতের সংখ্যা কম। হাজার হাজার মামলা বাতিল হয়েছে। অনেক নিষ্পত্তি ছাড়াই পড়ে আছে। সরকারের নিজস্ব নথিতেও জবাবদিহির ক্ষেত্রে বড় ধরনের ঘাটতি দেখা যাচ্ছে। পাঞ্জাবে দলবদ্ধ ধর্ষণের অস্বাভাবিক বেশি মামলা, খাইবার পাখতুনখাওয়ায় (কেপি) বিচারের দীর্ঘসূত্রতার মতো বিষয় মিলিয়ে পরিসংখ্যান এমন এক ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার চিত্র তুলে ধরছে, যেখানে অপরাধের মামলা নথিভুক্ত করাই ন্যায়বিচারের দীর্ঘ ও অনিশ্চিত যাত্রার শুরু হিসেবে দেখা গেছে। পাকিস্তানে ২০২১ সালের ধর্ষণবিরোধী আইন বা অ্যান্টি-রেপ (ইনভেস্টিগেশন অ্যান্ড ট্রায়াল) অ্যাক্ট, ২০২১ প্রণয়ন করা হয়েছিল। যার উদ্দেশ্য ছিল বিশেষ আদালত, সংকট মোকাবিলা কেন্দ্র, প্রশিক্ষিত তদন্তকারী ও দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা। তবে প্রায় পাঁচ বছর পরও কেন্দ্রীয় সরকার বিচারব্যবস্থার মৌলিক কার্যক্রমগুলো ঠিকভাবে পরিচালনায় হিমশিম খাচ্ছে। ফলে ধর্ষণের শিকার ব্যক্তিদের ন্যায়বিচার পাওয়ার প্রক্রিয়া খণ্ডিত, ধীরগতির ও পরিমাপ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।   ধর্ষণবিরোধী আইনের উদ্দেশ্য ছিল সাধারণ ফৌজদারি বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা কমিয়ে বিশেষ আদালত, বিশেষায়িত পুলিশ তদন্ত ইউনিট, হাসপাতালভিত্তিক সংকট মোকাবিলা কেন্দ্র, ফরেনসিক পরীক্ষা এবং জাতীয় যৌন অপরাধী নিবন্ধনের সমন্বয়ে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা। কিন্তু সরকারের পর্যবেক্ষণমূলক তথ্য থেকে জটিল এক চিত্র উঠে এসেছে। ধারণা করা হচ্ছে, ব্যবস্থাটির বিভিন্ন অংশ এখনো পরস্পরের সঙ্গে কার্যকরভাবে যুক্ত হতে পারেনি। প্রতিবেদনে মামলার পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখানো হয়েছে, অভিযোগ নথিভুক্ত ও এজাহার (এফআইআর) দায়েরের পর তদন্ত, অভিযোগপত্র দাখিল, বিচারপ্রক্রিয়া ও চূড়ান্ত রায় পর্যন্ত একটি মামলা কীভাবে এগোয়। ধর্ষণ মামলা সবচেয়ে বেশি পাঞ্জাবে  ২০২১ সাল থেকে ২০২৬ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত পাকিস্তানে নথিভুক্ত ধর্ষণ-সংশ্লিষ্ট সব মামলার ৮৯.৭ শতাংশই পাঞ্জাবে। দেশজুড়ে নথিভুক্ত ধর্ষণ-সংশ্লিষ্ট মোট মামলার ৬২.৮ শতাংশই দলবদ্ধ ধর্ষণের। এর মধ্যে ৯৯.২ শতাংশ মামলা পাঞ্জাবে নথিভুক্ত হয়েছে। প্রদেশটিতে মোট মামলার ৬৯.৪ শতাংশ দলবদ্ধ ধর্ষণের। সেখানে দলবদ্ধ ধর্ষণের মামলা ২৯ হাজার ৫৫৫টি, যা এক ব্যক্তির ধর্ষণের ৪ হাজার ৪৯৪টি মামলার তুলনায় ৬.৬ গুণ বেশি। অন্য সব প্রদেশে চিত্রটি উল্টো। সিন্ধুতে একজনের ধর্ষণের মামলা দলবদ্ধ ধর্ষণের তুলনায় ৪.৩ গুণ, কেপিতে ৫১ গুণ এবং বেলুচিস্তানে ৪৭ গুণ বেশি। আইনটি কার্যকর হওয়ার পর প্রথম চার সপ্তাহে, অর্থাৎ ২০২১ সালের ৪ থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত পাঞ্জাবে ১ হাজার ১১টি দলবদ্ধ ধর্ষণের মামলা এবং একজনের ধর্ষণের ১৫টি মামলা নথিভুক্ত হয়। অর্থাৎ পাকিস্তানের সরকারি গেজেটে ধর্ষণবিরোধী আইন প্রকাশের দিন থেকেই পাঞ্জাবের পরিসংখ্যান গণনা শুরু হয়েছে। ২০২২ সালে পাঞ্জাবে দলবদ্ধ ধর্ষণের মামলার সংখ্যা একজনের ধর্ষণের মামলার তুলনায় ১৬ গুণ ছিল। ২০২৫ সালে এ অনুপাত কমে ৩.৪ গুণে দাঁড়ায়। ওই বছর একজনের ধর্ষণের মামলা বেড়ে এক হাজার ৮৪৬টিতে পৌঁছায়। অন্যদিকে দলবদ্ধ ধর্ষণের মামলা আগের বছরের তুলনায় কমে ছয় হাজার ৩০০টি হয়। ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে একজনের ধর্ষণের মাসিক মামলা নথিভুক্ত হওয়ার হার ২০২৫ সালের মাসিক গড়ের তুলনায় প্রায় ৪০ শতাংশ কম ছিল। দলবদ্ধ ধর্ষণের মামলাও গত বছরের মাসিক গড়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। তবে শিশু ধর্ষণের মামলা উল্টো বেড়েছে। ২০২৫ সালে মাসে গড়ে ১৪৫টি মামলা নথিভুক্ত হয়েছিল। ২০২৬ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৮৭টিতে, যা ২৯ শতাংশ বেশি। শিশুদের বিরুদ্ধে অপরাধের পরিস্থিতি উদ্বেগজনকভাবে স্থায়ী। ২০২১ সাল থেকে পাঞ্জাবে শিশু ধর্ষণের আট হাজার ১৫৪টি মামলা নথিভুক্ত হয়েছে, যা প্রদেশটির ধর্ষণ-সংশ্লিষ্ট মোট মামলার ১৯.২ শতাংশ। শুধু ২০২৪ সালেই এ ধরনের মামলা ছিল এক হাজার ৯১৬টি, অর্থাৎ দিনে পাঁচটিরও বেশি। নিরাপদ নয় পুলিশের হেফাজতও ২০২১ সাল থেকে ২০২৬ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত পাঞ্জাবে হেফাজতে ধর্ষণের ২১৪টি মামলা হয়েছে। জাতীয় পরিসংখ্যানে এ ধরনের মামলার ৯৯.৫ শতাংশই পাঞ্জাবের। বেলুচিস্তান ছাড়া অন্য কোনো প্রদেশে হেফাজতে ধর্ষণের মামলা নথিভুক্ত হয়নি। ২০২৪ সালে হেফাজতে ধর্ষণের মামলা বেড়ে ৬৮টিতে দাঁড়ায়। ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসেই এ ধরনের ৩৬টি মামলা হয়েছে, যা ২০২৫ সালের পুরো বছরের ৩৯টি মামলার প্রায় সমান। এসব মামলায় দণ্ডিত হয়েছেন একজন, আর খালাস পেয়েছেন ৫১ জন। পাঞ্জাবে ধর্ষণের পর হত্যার ১৫১টি মামলাও নথিভুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ১৩টি মামলায় দণ্ডাদেশ হয়েছে, ৪৩টিতে আসামিরা খালাস পেয়েছেন এবং ৮৩টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। সমস্যাটি শুধু গ্রেফতারের অভাব নয়। পুলিশের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ধর্ষণ-সংশ্লিষ্ট মামলায় অভিযুক্ত ৫৭ হাজার ১৫৯ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে, যা মোট অভিযুক্তের ৯১ শতাংশ। ২০২১ সাল থেকে ২০২৬ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত পাঞ্জাবে ধর্ষণ-সংশ্লিষ্ট ৯ হাজার ১৫৫টি মামলা বাতিল করা হয়েছে, যা মোট মামলার ২১.৫ শতাংশ। এর মধ্যে ৬ হাজার ৯৯৫টি দলবদ্ধ ধর্ষণের মামলা। একই সময়ে প্রদেশটির আদালত বিভিন্ন শ্রেণির ধর্ষণ-সংশ্লিষ্ট মামলায় ৬৩৯ জনকে দণ্ডিত করেছেন। খালাস পেয়েছেন ১২ হাজার ৭৪১ জন। অর্থাৎ প্রতি একজন দণ্ডিতের বিপরীতে গড়ে প্রায় ২০ জন আসামি খালাস পেয়েছেন। শুধু দলবদ্ধ ধর্ষণের ক্ষেত্রে খালাস ও দণ্ডাদেশের অনুপাত ২৬:১। এ পরিস্থিতিকে শুধু বিচারপ্রক্রিয়ার ধীরগতির ফল বলেও ব্যাখ্যা করা যায় না। কারণ, সর্বশেষ পূর্ণাঙ্গ বার্ষিক তথ্য পাওয়া ২০২২ ও ২০২৩ সালেও দলবদ্ধ ধর্ষণের মামলায় ১৯৪ জন দণ্ডিত হওয়ার বিপরীতে ৪ হাজার ৫৮৬ জন খালাস পেয়েছেন। যেখানে শিশু ভুক্তভোগীর সংখ্যা বেশি খাইবার পাখতুনখাওয়ার (কেপি) ধর্ষণ-সংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণে শিশুদের ওপর যৌন সহিংসতার বিষয়টি সবচেয়ে বেশি সামনে এসেছে। ২০২১ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত প্রদেশটিতে নথিভুক্ত ৩ হাজার ১৯৭টি মামলার মধ্যে ১ হাজার ৯০৭টি, অর্থাৎ ৫৯.৬ শতাংশের ভুক্তভোগী শিশু। শিশু ধর্ষণের মামলা ২০২১ সালে ২৭০টি ছিল। ২০২৫ সালে তা বেড়ে ৪২৩টিতে দাঁড়ায়। কেপিতে শিশু ধর্ষণের মামলা সিন্ধুর তুলনায় ৭.৪ গুণ বেশি। প্রাপ্তবয়স্কদের ধর্ষণের মামলাও প্রদেশটিতে বেড়েছে। ২০২১ সালে এ ধরনের মামলা ছিল ১৯৪টি, যা ২০২৪ সালে বেড়ে ২৫৭টিতে পৌঁছায়। একই সময়ে কেপিতে দলবদ্ধ ধর্ষণের ২৪টি মামলা নথিভুক্ত হয়েছে। অন্যদিকে হেফাজতে ধর্ষণের কোনো মামলা নথিভুক্ত হয়নি। তবে এসব ঘটনা সত্যিই ঘটেনি, নাকি মামলা নথিভুক্ত করতে অনীহা রয়েছে, তা নিশ্চিত করা প্রায় অসম্ভব। পাঞ্জাবের বিপরীতে কেপিতে পুলিশ প্রায় সব মামলাই আদালতে পাঠায়। প্রদেশটিতে ৯৮ শতাংশ মামলায় অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়েছে। কিন্তু এরপরই বিচারপ্রক্রিয়া জটিল হয়ে পড়ে। এ সময়ে মোট মামলার ৮২.৫ শতাংশ, অর্থাৎ ২ হাজার ৬৩৯টি এখনো বিচারাধীন। শিশুদের বিরুদ্ধে ধর্ষণের ১ হাজার ৯০৭টি মামলার মধ্যে ১ হাজার ৮০৭টি, অর্থাৎ ৯৪.৮ শতাংশ এখনো বিচারাধীন। কেপিতে শিশু ধর্ষণের সর্বশেষ দণ্ডাদেশের তথ্য পাওয়া যায় ২০২১ সালের। ওই বছর এ ধরনের মামলায় নয়জনকে দণ্ডিত করা হয়েছিল। এরপর ২০২২ সাল থেকে ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত প্রদেশটিতে শিশু ধর্ষণের এক হাজার ৬৩৭টি মামলা নথিভুক্ত হলেও কোনো দণ্ডাদেশ হয়নি। এ সময়ে আটটি মামলায় আসামিরা খালাস পেয়েছেন। একই সময়ে ধর্ষণের পর হত্যার ৩৮টি মামলার সবগুলোতেই ভুক্তভোগী শিশু। এর মধ্যে ৩৭টি মামলা আদালতে রয়েছে। কোনো মামলাতেই দণ্ডাদেশ বা খালাসের তথ্য নেই। ইওস পত্রিকার সঙ্গে নাম প্রকাশ না করার শর্তে কথা বলা কেপির প্রসিকিউশন অধিদপ্তরের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা তদন্তপ্রক্রিয়াকে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তার মতে, যথাযথ তদন্ত চালানোর মতো সম্পদ, দক্ষতা ও প্রশিক্ষণের ঘাটতি রয়েছে প্রসিকিউশন বিভাগে। তিনি বলেন, ‘এ ধরনের মামলা পরিচালনার জন্য আমাদের কর্মী ও কর্মকর্তাদের যথাযথ প্রশিক্ষণ নেই।’ তিনি আরও জানান, মালাকান্দ বিভাগের সব জেলায় নারীর প্রতি সহিংসতার অধিকাংশ মামলা নিজাম-ই-আদল রেগুলেশন, ২০০৯-এর আওতায় আপসযোগ্য ছিল। অর্থাৎ আদালতের বাইরে সমঝোতার মাধ্যমে সেগুলোর নিষ্পত্তি করা যেত। তার ভাষায়, ‘এ ধরনের অধিকাংশ মামলাই আপসের মাধ্যমে শেষ হয়, কারণ ওই এলাকার আইন সে সুযোগ দেয়।’ সিন্ধুর পরিসংখ্যানে ঘাটতি ২০২১ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত পাকিস্তানে নথিভুক্ত ধর্ষণ-সংশ্লিষ্ট মোট মামলার মাত্র ৩.২ শতাংশ সিন্ধুর। পাঞ্জাবের তুলনায় এখানকার চিত্র বিপরীত। সিন্ধুর মোট ১ হাজার ৫১০টি মামলার ৬৪.৯ শতাংশ একজনের ধর্ষণ এবং ১৫ শতাংশ দলবদ্ধ ধর্ষণের। প্রদেশটিতে ধর্ষণের মামলা নথিভুক্ত হওয়ার প্রবণতা ঊর্ধ্বমুখী। ২০২২ সালে বার্ষিক মামলা ছিল ১৫৯টি। ২০২৫ সালে তা বেড়ে ৩৫৮টিতে দাঁড়ায়, যা ১২৫ শতাংশ বৃদ্ধি। ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে সিন্ধুতে ধর্ষণের ১৯৬টি মামলা হয়েছে। এটি আগের বছরের মোট মামলার ৫৫ শতাংশ। একজনের ধর্ষণের মামলা ২০২২ সালের ৯৭টি থেকে বেড়ে ২০২৫ সালে ২৫৩টিতে দাঁড়ায়। একই সময়ে দলবদ্ধ ধর্ষণের মামলা ২৪টি থেকে বেড়ে ৬৪টি হয়। সিন্ধুতে ধর্ষণের পর হত্যার ৪৬টি মামলা রয়েছে, যা চার প্রদেশে নথিভুক্ত এ ধরনের মোট মামলার ১৯.৬ শতাংশ। সিন্ধুর প্রধান ব্যর্থতা হলো অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার করতে না পারা। সব ধরনের মামলায় প্রদেশটিতে ১ হাজার ৭৩ জন অভিযুক্তকে হেফাজতে রাখা হয়েছে, আর ৯৮৮ জন পলাতক রয়েছেন। অর্থাৎ মোট অভিযুক্তের ৪৮ শতাংশের বিরুদ্ধে হেফাজতে থাকার তথ্য নেই। তুলনায় পাঞ্জাবে পলাতক অভিযুক্তের হার ৯ শতাংশ। সিন্ধুতে দলবদ্ধ ধর্ষণের মামলায় হেফাজতে থাকা অভিযুক্তের চেয়ে পলাতক অভিযুক্তের সংখ্যা বেশি। এ ধরনের মামলায় ১৫৯ জন হেফাজতে থাকলেও ২১৩ জন পলাতক। তদন্তেও সিন্ধুতে দীর্ঘসূত্রতা দেখা যাচ্ছে। প্রদেশটিতে নথিভুক্ত মামলার মাত্র ৬৫.৮ শতাংশ আদালতে পৌঁছায়, যা চার প্রদেশের মধ্যে সর্বনিম্ন। আরও ২৯৫টি মামলা, অর্থাৎ মোট মামলার ১৯.৫ শতাংশ, বাতিলও হয়নি, আবার বিচারের জন্য আদালতেও পাঠানো হয়নি। কার্যত এসব মামলা প্রক্রিয়ার বাইরে পড়ে আছে। সিন্ধুর তথ্য আরও অস্পষ্ট হওয়ার কারণ হলো, সেখানে দণ্ডাদেশ, খালাস কিংবা বিচারাধীন মামলার কোনো হিসাব দেওয়া হয়নি। সংশ্লিষ্ট ঘরগুলো শূন্য রাখা হয়েছে, শূন্য সংখ্যা হিসেবে দেখানো হয়নি। এ ছাড়া সিন্ধুর তথ্যে হেফাজতে ধর্ষণের কোনো পৃথক শ্রেণিও নেই। বেলুচিস্তানের নীরবতা ২০২১ সাল থেকে ২০২৬ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত বেলুচিস্তানে সব ধরনের ধর্ষণ-সংশ্লিষ্ট মামলা নথিভুক্ত হয়েছে মাত্র ১৭৭টি। জাতীয় মোট মামলার এটি ০.৪ শতাংশ। অথচ পাকিস্তানের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৬ শতাংশ এ প্রদেশের বাসিন্দা। বেলুচিস্তানে বছরে গড়ে প্রায় ৩১টি ধর্ষণ-সংশ্লিষ্ট মামলা নথিভুক্ত হয়। অর্থাৎ প্রায় প্রতি ১২ দিনে একটি মামলা। মোট মামলার মধ্যে একজনের ধর্ষণের ঘটনা ৯৪টি এবং শিশু ধর্ষণের ঘটনা ৮০টি। এ সময়ে দলবদ্ধ ধর্ষণের দুটি, হেফাজতে ধর্ষণের একটি এবং ধর্ষণের পর হত্যার কোনো মামলা নথিভুক্ত হয়নি। সংখ্যাগুলো এত কম যে প্রশ্ন উঠছে, এসব তথ্য কি মাঠপর্যায়ের প্রকৃত পরিস্থিতি তুলে ধরছে? বেলুচিস্তানের পুলিশ ও প্রসিকিউশন বিভাগের আইনজীবীরা বলছেন, সামাজিক কলঙ্কের ভয়, থানায় পৌঁছানোর জন্য দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার অসুবিধা এবং প্রচলিত গোত্রভিত্তিক বিচারব্যবস্থার কারণে অনেক ধর্ষণের ঘটনা এজাহার পর্যন্ত পৌঁছায় না। তবে বেলুচিস্তানের আদালতে বিচারপ্রক্রিয়া তুলনামূলক দ্রুত এগোয় বলে মনে হচ্ছে। প্রদেশটিতে মাত্র ৪৮টি মামলা বিচারাধীন, যা মোট মামলার ২৭ শতাংশ। কেপিতে বিচারাধীন মামলার হার ৮২.৫ শতাংশ। দণ্ডাদেশের অনুপাতেও বেলুচিস্তান অন্য প্রদেশগুলোর তুলনায় এগিয়ে। সেখানে ২৩ জন দণ্ডিত হওয়ার বিপরীতে ৯০ জন খালাস পেয়েছেন। অর্থাৎ প্রতি একজন দণ্ডিতের বিপরীতে প্রায় চারজন খালাস পেয়েছেন। ২০২২ সালে হেফাজতে ধর্ষণের যে একটি মামলা নথিভুক্ত হয়েছিল, তাতে দণ্ডাদেশ হয়েছে। শিশু ধর্ষণের ক্ষেত্রেও নতুন উদ্বেগ দেখা যাচ্ছে। ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসেই ১২টি মামলা হয়েছে, যা ২০২৫ সালের পুরো বছরের আটটি মামলার চেয়ে বেশি। বিচারপ্রক্রিয়া এগোয় যেভাবে ধর্ষণবিরোধী আইন কতটা কার্যকর, তা বিশ্লেষণের আগে পাকিস্তানের ফৌজদারি বিচারব্যবস্থায় একটি ধর্ষণ মামলা কোন কোন ধাপ অতিক্রম করে, তা বোঝা জরুরি। এজাহার (এফআইআর) দায়ের, ফরেনসিক ও চিকিৎসাবিষয়ক আইনগত প্রমাণ সংগ্রহ, পুলিশের তদন্ত, অভিযোগপত্র তৈরি, আদালতে রাষ্ট্রপক্ষের মামলা পরিচালনা এবং রায় ঘোষণা, প্রতিটি ধাপে আলাদা দায়িত্ব ও প্রক্রিয়া রয়েছে। এর যেকোনো পর্যায়ে সমস্যা দেখা দিলে মামলা আটকে যেতে পারে। ফলে মামলাটি বিচার পর্যন্ত পৌঁছাবে কি না এবং শেষ পর্যন্ত দণ্ডাদেশ হবে, নাকি আসামি খালাস পাবেন, তা প্রভাবিত হয়। তাই ওপরের পরিসংখ্যান বুঝতে এই প্রক্রিয়া সম্পর্কে ধারণা থাকা জরুরি। প্রথমে থানায় অভিযোগ গ্রহণ করা হয় এবং আইনের তফসিল-১ ও তফসিল-২ অনুযায়ী মামলাটি নথিভুক্ত করা হয়। অভিযোগকারীকে চিকিৎসাবিষয়ক আইনগত প্রমাণ সংগ্রহের জন্য ধর্ষণবিরোধী সংকট মোকাবিলা কেন্দ্রে (এআরসিসি) পাঠানো হয়। এরপর এজাহার দায়ের ও প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার কার্যক্রম চলে। আইনের তফসিল-২-এ ধর্ষণ, দলবদ্ধ ধর্ষণ, অপ্রাপ্তবয়স্কদের যৌন নিপীড়ন, শিশু পর্নোগ্রাফি, যৌন ব্যবসার উদ্দেশ্যে মানব পাচার এবং নারী ও শিশুর বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট অপরাধ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। দ্বিতীয় ধাপ হলো তদন্ত। এজাহার নথিভুক্ত হওয়ার পর বিশেষ যৌন অপরাধ তদন্ত ইউনিটের (এসএসওআইইউ) প্রশিক্ষিত কর্মকর্তারা তদন্তের দায়িত্ব নেন। এ পর্যায়ে মামলার তদন্ত শেষে অভিযোগপত্র বা চালান দাখিল করা হয়। অথবা মামলা বাতিল করা হয় কিংবা অপরাধের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিকে শনাক্ত করা সম্ভব না হলে সেটিকে অমীমাংসিত রাখা হয়। সবশেষে শুরু হয় বিচারপ্রক্রিয়া। বিশেষভাবে নিয়োগ করা সরকারি কৌঁসুলি মামলাটি যাচাই করে আদালতে বিচার কার্যক্রম শুরু করেন। এ উদ্দেশ্যে পাঞ্জাবে ১২৮ জন, বেলুচিস্তানে ১২৪ জন, কেপিতে ৩৪ জন, সিন্ধুতে ৩২ জন এবং ইসলামাবাদে দুজন কৌঁসুলিকে মনোনীত করা হয়েছে। এরপর বিশেষ আদালতে বিচার চলে। মামলার পরিণতি হয় দণ্ডাদেশ অথবা খালাস। দোষী সাব্যস্ত ব্যক্তিদের জাতীয় যৌন অপরাধী নিবন্ধনে (এসওআর) অন্তর্ভুক্ত করার কথা। অপরাধের তথ্য, রেফারেল ও ব্যবস্থার অবস্থা বেলুচিস্তানে শুরু থেকেই ধর্ষণবিরোধী সংকট মোকাবিলা কেন্দ্র (এআরসিসি) চালু ছিল না। এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে ইওস পত্রিকা বেলুচিস্তান পুলিশের মহাপরিদর্শকের (আইজি) কার্যালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল। তবে সেখান থেকে কোনো জবাব পাওয়া যায়নি। ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত পাকিস্তানের পুলিশ মোট ৮১৮টি মামলা এআরসিসিতে পাঠায়। এর মধ্যে সিন্ধুতে ৩৭৫টি রেফারেল এবং সরাসরি কেন্দ্রে গিয়ে আটটি অভিযোগ জানানোর ঘটনা ছিল। পাঞ্জাবে রেফারেল ছিল ২৩০টি এবং সরাসরি অভিযোগ জানানোর ঘটনা ৫৮টি। কেপিতে রেফারেল ছিল ১৫৭টি এবং সরাসরি অভিযোগ জানানোর ঘটনা ১৩টি। পাঞ্জাব পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক (এআইজি) তদন্ত শাহজাদা সুলতান ইওস-কে বলেন, বেশ কয়েকটি কারণে ধর্ষণের মামলা তদন্ত ও বিচারের ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি হচ্ছে। মামলাগুলো দুর্বল হয়ে পড়ছে। তিনি বলেন, মামলার তদন্ত কর্মকর্তা (আইও) শুধু একটি মামলার দায়িত্ব পালন করেন না। একজন তদন্ত কর্মকর্তাকে একই সঙ্গে আরও শত শত মামলা সামলাতে হয়। তিনি আরও বলেন, ‘তদন্ত চালিয়ে যাওয়ার জন্য আইওদের পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ নেই। এটি অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।’ সিন্ধু ও ইসলামাবাদের কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তাও তার বক্তব্যের সঙ্গে একমত হয়েছেন। তাদের মতে, যৌন সহিংসতার মামলা তদন্তে পুলিশ কর্মকর্তাদের বিশেষ প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। কিন্তু অধিকাংশ কর্মকর্তার এ বিষয়ে নির্দিষ্ট প্রশিক্ষণ নেই। এমনকি বিষয়টির সংবেদনশীলতা সম্পর্কেও তাদের যথেষ্ট ধারণাও নেই। শাহজাদা সুলতান আরও বলেন, যৌন সহিংসতার মামলায় সাক্ষীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। ২০২৫ সালের ৩১ অক্টোবর পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় আইন মন্ত্রণালয় ধর্ষণবিরোধী আইন বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণের জন্য ৩০ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে। কমিটিটি প্রতি তিন মাসে একবার বৈঠক করে। এসব বৈঠকে তথ্য পর্যালোচনা, উন্নয়নের প্রয়োজনীয় ক্ষেত্র চিহ্নিত করা এবং আইনের সংশোধন নিয়ে সুপারিশ করা হয়। পাকিস্তানের সাবেক জাতীয় পরিষদ সদস্য মেহনাজ আজিজ এ কমিটির একজন সদস্য। তার মতে, ‘কোনো ঘটনা সমাজে বা গণমাধ্যমে আলোচনায় না এলে নারীরা প্রায়ই ধর্ষণের অভিযোগ জানাতে এগিয়ে আসেন না।’ তিনি আরও বলেন, মামলা তুলে নেওয়ার জন্য নারীদের প্রায়ই পুরুষ বা পরিবারের সদস্যদের চাপের মুখে পড়তে হয়। রাষ্ট্রকে যে বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে, এটি তার অন্যতম। মেহনাজ আজিজ এ ধরনের আইন বাস্তবায়নে প্রশিক্ষিত নারী পুলিশ কর্মকর্তা নিয়োগ এবং পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দের ওপরও গুরুত্ব দেন। এছাড়া যৌন অপরাধ তদন্তের ক্ষেত্রে বিশেষ যৌন অপরাধ তদন্ত ইউনিটের (এসএসওআইইউ) কার্যক্রমেও বড় ঘাটতি রয়েছে। তদন্তে এ ইউনিটের ব্যবহার প্রত্যাশিত মাত্রায় হচ্ছে না। ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত ধর্ষণ-সংশ্লিষ্ট ৯ হাজার ৭৯টি এজাহার নথিভুক্ত হয়। এর মধ্যে ৭ হাজার ৩৪২টি মামলার দায়িত্ব এসএসওআইইউকে দেওয়া হয়েছিল। অন্যদিকে, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত সময়ের একটি পর্যালোচনায় দেখা যায়, সংশ্লিষ্ট অপরাধের ১৭ হাজার ৭৯৫টি ঘটনা নথিভুক্ত হলেও ৭২ ঘণ্টার মধ্যে চিকিৎসাবিষয়ক আইনগত পরীক্ষা হয়েছিল মাত্র ৯০৫টি ঘটনায়। ওই সময়ে পাঞ্জাবে এ ধরনের অপরাধের ১৬ হাজার ১৬৮টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছিল। কিন্তু ৭২ ঘণ্টার মধ্যে চিকিৎসাবিষয়ক আইনগত পরীক্ষা করা হয়েছিল মাত্র ৪৮০টি ঘটনায়। সিন্ধুর প্রধান পুলিশ সার্জন এবং আইন বাস্তবায়ন তদারকির জন্য গঠিত বিশেষ কমিটির সদস্য ডা. সুমাইয়া সৈয়দ-তারিকের মতে, এসব সংখ্যা শুধু হাসপাতালের কার্যক্রমের চিত্র নয়। তিনি ইওস-কে বলেন, ‘পরীক্ষা, নথিভুক্তকরণ এবং নমুনা সংরক্ষণের কাজ অত্যন্ত সতর্কতা ও নিষ্ঠার সঙ্গে করতে হয়।’ বিলম্ব, প্রশিক্ষণহীন চিকিৎসাবিষয়ক আইনগত কর্মকর্তা, অপর্যাপ্ত ফরেনসিক সুবিধা, প্রমাণ সংরক্ষণে দুর্বলতা কিংবা পুলিশ ও হাসপাতালের মধ্যে সমন্বয়হীনতার মধ্যে কোনটি প্রধান সমস্যা, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘মূল সমস্যা হলো কর্মীদের অনিচ্ছা এবং জবাবদিহির অভাব।’   সূত্র: ডন।

পাকিস্তানে ধর্ষণ মামলা: প্রতিশ্রুতি পূরণ হয়নি পাঁচ বছরেও