ঢাকা    সোমবার, ০৯ নভেম্বর ২০২৬
ঢাকা    সোমবার, ০৯ নভেম্বর ২০২৬
টিভি ২৬ নিউজ

৫০ বছরের দুর্ভোগের অবসান, সাঁকোর বদলে কাঠের সেতুতে বদলে যাচ্ছে তিন গ্রামের চিত্র

মুমূর্ষু রোগী কিংবা দুর্ঘটনায় আহত কাউকে দ্রুত উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়ার সুযোগ ছিল না। অসুস্থ হয়ে বিনা চিকিৎসায় বাড়িতে মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে। দৈনন্দিন প্রয়োজনে উপজেলা সদরসহ বিভিন্ন এলাকায় যাতায়াতের একমাত্র ভরসা ছিল ঝুঁকিপূর্ণ একটি সাঁকো। দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতিতে সাঁকো পার হতে গিয়ে দুর্ঘটনা ও অঙ্গহানির ঘটনাও ঘটেছে। দীর্ঘ ৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে এমন দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলার তিন গ্রামের মানুষকে। অবশেষে পুরোনো সাঁকোর বদলে কাঠের সেতু নির্মাণ করে দিয়েছে উপজেলা প্রশাসন। এতে বদলে যেতে শুরু করেছে গ্রামগুলোর যোগাযোগব্যবস্থা ও মানুষের জীবনযাত্রা। হাতিয়া উপজেলা সদর থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে তমরদ্দি ইউনিয়নের দক্ষিণে কোরালিয়া, পশ্চিম জোড়খালী ও মাইজচরা গ্রামের অবস্থান। তিন গ্রামে প্রায় ১০ থেকে ১৫ হাজার পরিবারের বসবাস বলে স্থানীয়রা জানান। এসব গ্রামের বাসিন্দাদের তমরদ্দি বাজারসহ বিভিন্ন স্থানে যাতায়াত করতে কাটাখালী খাল পার হতে হয়। স্বাধীনতার আগে থেকেই খালের ওপর নির্মিত সাঁকোটি ছিল তাদের যাতায়াতের প্রধান অবলম্বন। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, প্রায় ২০০ ফুট দীর্ঘ সাঁকোটি পার হতে গিয়ে বছরের পর বছর নানা দুর্ঘটনার শিকার হয়েছেন মানুষ। মুমূর্ষু রোগী, বয়স্ক ব্যক্তি ও শিক্ষার্থীদেরও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সাঁকো পার হতে হতো। দোকানের মালামাল মাথায় বহন করে খালের এপার-ওপার নিতে হতো। সাঁকো থেকে পড়ে আহত হওয়া, অঙ্গহানি এবং শিক্ষার্থীদের খালে পড়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে বলে তারা জানান। কোরালিয়া গ্রামের খালের পাড়ে বেড়িবাঁধের ওপর দোকান করেন নুরউদ্দিন শের আলী (৬০)। তিনি বলেন, তার দোকানের মালামাল তমরদ্দি বাজার থেকে আনতে হয়। ভ্যানচালকেরা মালামাল খালের ওপারে রেখে দেন। এরপর মাথায় করে সাঁকো পার হয়ে দোকানে পৌঁছে দিতে হয়। শের আলী জানান, গত বছর এভাবে মালামাল আনতে গিয়ে চিনির বস্তাসহ সাঁকো ভেঙে খালে পড়ে যান নুর ইসলাম নামের এক ভ্যানচালক। এতে তার এক হাত ও এক পা ভেঙে যায়। ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে চিকিৎসা নিয়েও তিনি সুস্থ হতে পারেননি। বর্তমানে পঙ্গুত্ব নিয়ে বাড়িতে অবস্থান করছেন। তিনি আরও জানান, গ্রামের শিক্ষার্থীদের এই সাঁকো পার হয়ে তমরদ্দি উচ্চবিদ্যালয়ে যেতে হয়। ২০২৫ সালের শেষের দিকে এক ছাত্রী সাঁকো থেকে খালে পড়ে ভেসে যেতে থাকলে সহপাঠীদের চিৎকারে দোকান থেকে লোকজন ছুটে গিয়ে তাকে উদ্ধার করেন। যোগাযোগের অভাবে বিয়েতেও অনীহা ছিল গ্রামের প্রবীণ বাসিন্দা সিরাজ মিয়া (৮৫) বলেন, যোগাযোগব্যবস্থা ভালো না হওয়ায় অন্য গ্রামের মানুষ এই এলাকায় মেয়েদের বিয়ে দিতে অনীহা প্রকাশ করতেন। ৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে তিনি এই সাঁকো পার হয়ে তমরদ্দি বাজারে যাতায়াত করছেন। তিনি বলেন, দিনের বেলায় কোনোভাবে যাতায়াত করা গেলেও রাতে সাঁকো পার হওয়া ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। একবার তার ছেলের স্ত্রীর প্রথম সন্তান প্রসবের সময় জটিলতা দেখা দেয়। গ্রামের চিকিৎসকেরা দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দিলেও রাতে খাল পার হওয়ার ব্যবস্থা না থাকায় সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। পরে নৌকায় খাল পার হয়ে হাসপাতালে যেতে হয়েছিল। সিরাজ মিয়া আরও বলেন, নির্বাচনের সময় বিভিন্ন জনপ্রতিনিধি সেতু নির্মাণের আশ্বাস দিলেও পরে আর উদ্যোগ নেননি। সম্প্রতি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রাসেল ইকবাল একটি কাজে গ্রামে এসে সাঁকোটি দেখে থমকে দাঁড়ান। পরে স্থানীয়দের কাছ থেকে দীর্ঘদিনের দুর্ভোগের কথা শুনে তিনি নিজ উদ্যোগে কাঠের সেতু নির্মাণের ব্যবস্থা করেন। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে গ্রামের মানুষের দীর্ঘদিনের কষ্ট কিছুটা লাঘব হতে দেখে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন তিনি। সম্প্রতি সরেজমিন দেখা যায়, নতুন সেতুটি দেখতে গ্রামের বিভিন্ন বয়সী মানুষ ভিড় করছেন। শিশু থেকে বৃদ্ধ—সবার মধ্যে আনন্দ-উচ্ছ্বাস। শুধু স্থানীয় বাসিন্দারাই নন, আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকেও মানুষ সেতুটি দেখতে আসছেন। সম্পূর্ণ কাঠ দিয়ে নির্মিত সেতুটির নিচে রয়েছে সিমেন্টের খুঁটি। এর ওপর কাঠের পাটাতন বসানো হয়েছে এবং দুই পাশে দেওয়া হয়েছে হাতল। রং দিয়ে সাজানো সেতুটি দূর থেকে বেশ দৃষ্টিনন্দন দেখায়। বর্তমানে স্থানীয় বাসিন্দারা সাইকেল ও মোটরসাইকেল নিয়ে সেতুটি পারাপার করছেন। তাদের আশা, একদিন এই কাঠের সেতুর জায়গায় নির্মিত হবে স্থায়ী পাকা সেতু। প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরের সোনাদিয়া থেকে সেতুটি দেখতে এসেছেন কনটেন্ট ক্রিয়েটর আরিয়ান ফরিদ। তিনি বলেন, লম্বা সেতুটি রং দিয়ে সাজানো হয়েছে। দূর থেকে দেখতে ছোট নদীর ওপর নির্মিত বড় কোনো সেতুর মতো মনে হয়। জায়গাটি এখন দর্শনীয় স্থানে পরিণত হয়েছে। তাই ড্রোন ক্যামেরা নিয়ে এসে ভিডিও ধারণ করছেন, যা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করবেন। এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রাসেল ইকবাল বলেন, যোগাযোগব্যবস্থার অভাবে এলাকাটি অনেকটা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল। মানুষের স্বাভাবিক চাহিদা পূরণেও নানা সমস্যা হচ্ছিল। একটি সাঁকোকে কাঠের সেতুতে রূপান্তরের মাধ্যমে এলাকার মানুষের আর্থসামাজিক উন্নয়নে সামান্য হলেও ভূমিকা রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। এখানে স্থায়ী পাকা সেতু নির্মাণের জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে জানানো হয়েছে।

৫০ বছরের দুর্ভোগের অবসান, সাঁকোর বদলে কাঠের সেতুতে বদলে যাচ্ছে তিন গ্রামের চিত্র