ঢাকা    বুধবার, ০৭ অক্টোবর ২০২৬
ঢাকা    বুধবার, ০৭ অক্টোবর ২০২৬
টিভি ২৬ নিউজ
নোটিশ
  • টিভি ২৬ নিউজ  সারাদেশে প্রতিনিধি নিয়োগ দিচ্ছে ফোরকানুল হক (সাকিব) সম্পাদিত " TV 26 NEWS " আগ্রহীরা দ্রুত যোগাযোগ করুন। সব খবর সবার আগে পেতে আমাদের সাথেই থাকুন।
সর্বশেষ

৭৩ হত্যাকাণ্ড: কীভাবে জামিন পাচ্ছে হত্যা মামলার আসামিরা, বাবা-ছেলের পর কে?


TV 26 NEWS ডেস্ক :
TV 26 NEWS ডেস্ক :
প্রকাশ ০৭ অক্টোবর ২০২৬ | ০৮:৩০ পিএম
| প্রিন্ট সংস্করণ | ফটো কার্ড

৭৩ হত্যাকাণ্ড: কীভাবে জামিন পাচ্ছে হত্যা মামলার আসামিরা, বাবা-ছেলের পর কে?
দেড় মাসের ব্যবধানে একই পরিবারের বাবা ও ছেলে খুন

খুলনায় একের পর এক হত্যা, গুলি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ ও নিরাপত্তাহীনতা বাড়ছে। অস্ত্রধারী ও বিভিন্ন হত্যা মামলার আসামিরা গ্রেফতার হয়ে অল্প সময়ের মধ্যে জামিনে বেরিয়ে আসছেন। এসব আসামি উচ্চ আদালত থেকে জামিনে বেরিয়ে অপরাধ ও হত্যাকাণ্ডে জড়াচ্ছেন। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত খুলনায় ৭৩ হত্যাকাণ্ড ঘটেছে, যা জনমনে আতঙ্ক বাড়িয়ে দিয়েছে। নগরীর বাসিন্দাদের কেউ কেউ বলছেন, এরপর কে? কারণ একদিন কিংবা দুদিন পরই ঘটছে হত্যাকাণ্ড। 

সবশেষ রূপসা উপজেলার আইচগাতি ইউনিয়নের দুর্জনীমহল গ্রামে আক্তার ঢালীকে গুলি করে হত্যার পর তার স্ত্রী নাসিমা বেগম আতঙ্কের কথা জানালেন। সেইসঙ্গে বলেছেন, ছেলে হত্যার আসামিরা জামিনে এসে বাবাকে মেরে ফেললো, জীবনের নিরাপত্তা চেয়ে থানায় জিডি করা হয়েছিল। কিন্তু পুলিশ তাকে বাঁচাতে পারলো না। ফলে আর মামলা করতে চান না। এমন কিছু ঘটার ভয়ে মুখ খোলারও সাহস করছেন না। 

পুলিশও বলছে, আসামিরা জামিনে বেরিয়ে ফের জড়াচ্ছে অপরাধে। তারা আরও ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করছে। প্রত্যেক ঘটনার পরই দুই-চার জন আসামিকে গ্রেফতার করা হয়। কিন্তু তারা দ্রুত জামিনে বেরিয়ে যায়।

এমন পরিস্থিতিতে খুলনায় বারবার হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন সচেতন নাগরিক ও সাধারণ মানুষজন। সম্প্রতি কয়েকটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা নিয়ে সমালোচনা হলেও অপরাধের পুনরাবৃত্তি ঠেকানো নিয়ে উদ্বেগ থেকেই যাচ্ছে। নগরবাসীর প্রশ্ন, একই ধরনের অপরাধে জড়িতদের গ্রেফতার করা হলেও তারা কীভাবে দ্রুত জামিনে বেরিয়ে যাচ্ছে।

একদিকে অপরাধীদের গ্রেফতার, অন্যদিকে জামিনে বেরিয়ে পুনরায় অপরাধে জড়িয়ে পড়া—এই দুইয়ের মধ্যে সমন্বিতভাবে কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে নগরীর নিরাপত্তা নিয়ে মানুষের উদ্বেগ আরও বাড়তে পারে বলে মনে করছেন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা।

মহানগরীতে ৩৮ হত্যাকাণ্ড

খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের (কেএমপি) দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাস থেকে এখন পর্যন্ত খুলনা মহানগরীতে ৩৮টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এসব ঘটনায় ২৩টি হত্যা মামলা হয়েছে। কারণ একাধিক হত্যার ঘটনায় একটি মামলা হওয়ায় মোট মামলার সংখ্যা ২৩টি। এসব মামলার মধ্যে পুলিশের হিসাবে ১৯টির রহস্য উদ্ঘাটন হয়েছে, গ্রেফতার হয়েছেন ৮১ জন। বাকিগুলোর তদন্ত চলছে। 

পুলিশ বলছে, রহস্য উদঘাটন হওয়া ১৯টি মামলার ১৭টি তদন্তাধীন এবং দুটি বিচারাধীন। এগুলোর ১৪টিতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি নেওয়া হয়েছে। তদন্তে দেখা যায়, নয়টি হত্যায় পারিবারিক ও ব্যক্তিগত বিরোধ, সাতটিতে মাদক ও আধিপত্য বিস্তার নিয়ে দ্বন্দ্ব, দুটিতে ইজিবাইক চুরি এবং একটি চোর সন্দেহে পিটুনির ঘটনা।

জেলায় ৩৫ হত্যাকাণ্ড

খুলনা জেলা পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত খুলনা জেলার নয়টি থানা এলাকায় ৩৫টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এসব ঘটনায় ৩৫টি মামলা হয়েছে। এগুলোর মধ্যে ২৫টির রহস্য উদঘাটন হয়েছে। এর মধ্যে নয়টি হত্যা ঘটেছে গুলিতে। পারিবারিক বিরোধে চারটি, শ্বাসরোধে দুটি, রাজনৈতিক কারণে দুটি, সামাজিক বিরোধে ১৩টি, কুপিয়ে তিনটি আর দুটি অজ্ঞাত কারণে। এর মধ্যে গুলিতে নয়টি ও কুপিয়ে তিনটি ঘটনার পেছনে রয়েছে মাদক, চুরি-ছিনতাই ও আধিপত্য বিস্তার।

হত্যা মামলার আসামিরা জামিনে বেরিয়ে হত্যাকাণ্ড ঘটাচ্ছে

সবমিলিয়ে জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। এর মধ্যে রূপসায় ছেলেকে হত্যার দেড় মাসের মাথায় বাবাকে হত্যার ঘটনাটি চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। ছেলে হত্যা মামলার আসামিরা উচ্চ আদালত থেকে জামিনে এসে বাবাকে হত্যা করেছেন বলে জানিয়েছেন স্বজনরা। এর আগে লবণচরায় তিন ঘণ্টার ব্যবধানে দুটি হত্যার পেছনেও জামিনে বেরিয়ে আসা অপরাধীর সংযোগের কথা জানিয়েছে পুলিশ। 

আতঙ্কে চুপ ভুক্তভোগীরা

খুনের পর শুধু একটি পরিবার নয়, গোটা এলাকার মানুষ আতঙ্কের মধ্যে ঢুকে পড়ছে। এ কারণে খুনের শিকার পরিবারগুলোও নির্বিকার হয়ে চুপ থাকছে। তারা মামলা করারও সাহস হারিয়ে ফেলছে। প্রতিবেশী, প্রত্যক্ষদর্শী, সাধারণ মানুষও ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে নীরবতা পালন করছে। 

তবু পুলিশ বলছে, ভুক্তভোগী ও সাধারণ মানুষকে মুখ খুলতে হবে, তথ্য দিতে হবে। কিন্তু যে মানুষটি তথ্য দেবেন, তার নিরাপত্তা কি নিশ্চিত হবে, সেই প্রশ্নেরও উত্তর দিতে পারছে না পুলিশ। যার প্রমাণ আক্তার ঢালী। ছেলেকে হত্যা মামলার আসামিরা জামিনে বেরিয়ে হুমকি দেওয়ার পর জীবনের নিরাপত্তা চেয়ে থানায় ১৫ দিন আগে জিডি করলেও তাকে বাঁচাতে পারেনি পুলিশ; এমনকি তার পরিবারকে নিরাপত্তা দিতে পারেনি।

নগরীর একাধিক বাসিন্দা জানিয়েছেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান ও গ্রেফতারের পর অভিযুক্তদের কেউ কেউ অল্প সময়ের মধ্যে কারাগার থেকে জামিনে বেরিয়ে আসায় মানুষের মধ্যে হতাশা তৈরি হচ্ছে। অপরাধীরা দ্রুত জামিনে বেরিয়ে আসার বিষয়টি আইনগত প্রক্রিয়ার অংশ হলেও হত্যা মামলার আসামিদের দ্রুত সময়ের মধ্যে জামিন পাওয়ার ঘটনা তাদের অসহায় করে তুলছে।

অপরাধীরা হত্যা করতে বিন্দুমাত্র চিন্তা করছে না

মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থা খুলনার সমন্বয়কারী অ্যাডভোকেট মোমিনুল ইসলাম বলেন, ‌‘সমাজে নৈতিকতার অবক্ষয় দেখা দিয়েছে। একজন মানুষের জীবন কেড়ে নিতে এখন অপরাধীরা বিন্দুমাত্র চিন্তা করছে না। পারিবারিক নৈতিক শিক্ষা ও অনুশাসনের অভাব এর অন্যতম কারণ। পরিবার থেকেই সন্তানদের নৈতিক শিক্ষা ও সামাজিক মূল্যবোধের চর্চা নিশ্চিত করতে হবে।’

একই কথা বলেছেন কেএমপির ডেপুটি পুলিশ কমিশনার (সদর) এম এম শাকিলুজ্জামান। তিনি বলেন, ‘সামাজিক অবক্ষয়ের কারণেই তরুণ সমাজের একটি অংশ অপরাধের দিকে ধাবিত হচ্ছে। আগে পাড়া-মহল্লায় মুরুব্বিদের কথা শোনা হতো। তারা অনেক সময় অশিক্ষিত হলেও এলাকায় সামাজিক শৃঙ্খলা বজায় রাখতেন। এখন সেই সামাজিক অনুশাসন অনেকটাই কমে গেছে। বর্তমানে মুরুব্বিদের সালাম দেওয়ার সংস্কৃতিও হারিয়ে গেছে। যুব সমাজকে সঠিক পথে রাখতে হলে প্রতিটি ঘরে ঘরে বাবা-মাকেই দায়িত্ব নিতে হবে। সামাজিক অনুশাসন মেনে চলতে হবে এবং আগের সামাজিক মূল্যবোধের জায়গায় ফিরে যেতে হবে। একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি মানুষের আস্থা ও বিশ্বাস রাখতে হবে।’

কীভাবে জামিন পাচ্ছেন হত্যা মামলার আসামিরা?

গত ১৫ আগস্ট সন্ধ্যায় দুর্জনীমহলের শহীদের মোড়ে ছেলে জয় ঢালীকে কুপিয়ে ও গলা কেটে হত্যা করা হয়। ওই ঘটনায় জয়ের মা নাসিমা বেগম বাদী হয়ে ১৩ জনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেন। মামলায় গ্রেফতার আসামিরা পরে উচ্চ আদালত থেকে জামিনে বেরিয়ে আসেন। তারা বাদীর স্বামী আক্তারকে ভয়ভীতি দেখিয়ে মামলা তুলে নিতে চাপ দেন। এরপর ৬ অক্টোবর বাড়ির সামনে আক্তার ঢালী নিহত হন। ছেলে হত্যা মামলার আসামিরা জামিনে বেরিয়ে এসে তার বাবাকে হত্যা করেছেন বলে জানান নাসিমা।

নাসিমা বেগম জানান, জয় ঢালী হত্যা মামলা নিয়ে চাপের মধ্যে ছিলেন বাবা আক্তার ঢালী। মামলা তুলে নিতে তাকে বলা হয়েছিল এবং প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়েছিল। হুমকির পর গত ২১ সেপ্টেম্বর রূপসা থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন আক্তার। কিন্তু আসামিরা কীভাবে জামিন পেলেন তা তার জানা নেই।

রূপসা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আনোয়ার জাহিদ বলেন, ‘জীবনের নিরাপত্তা চেয়ে আবেদনের দুদিন পর জিডিটি নথিভুক্ত করা হয়েছিল। রূপসা থানার জিডি নং-১৪১২ তাং-২৩/০৯/২৬।’

রূপসা থানায় করা জিডির আবেদনে আক্তার ঢালী উল্লেখ করেন, গত ১৮ সেপ্টেম্বর রাত পৌনে ৯টার দিকে সেনরেবাজার এলাকায় মামলার আসামি মুনজিল শেখ, মুরাদ শেখ, মাসুদ মোল্যা ও রোপা মোল্যা আমাকে ডেকে নিয়ে যান। তখন মামলা তুলে নেওয়ার জন্য বিভিন্ন ধরনের হুমকি-ধমকি দেন তারা। এমনকি জীবনে মেরে ফেলার হুমকি দেন। এ অবস্থায় আমি ঘটনাস্থল ত্যাগ করে চলে আসি।’ 

জিডিতে আক্তার ঢালী আরও লিখেন, ‘এর আগে একই আসামিরা আমার ছেলে জয় ঢালীকে দুর্জনীমহলের শহীদের মোড়ে কুপিয়ে হত্যা করেছিল। ওই মামলার আসামিরা হাইকোর্ট থেকে জামিনে এলাকায় এসে মামলা তুলে নেওয়ার জন্য আমিসহ আমার পরিবারের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। জানমালের ক্ষতি করবে বলে হুমকি দিতাছে। আসামিদের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে আমি ও আমার পরিবারবর্গ চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতেছি বিধায় আসামিদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণসহ আমার জীবনের নিরাপত্তার জন্য জিডি করছি।’

জামিনের পর হুমকির বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে তদন্তে পুলিশ

খুলনার পুলিশ সুপার সরকার ওমর ফারুক বলেন, ‘জয় ঢালী হত্যা মামলার আসামিরা উচ্চ আদালত থেকে জামিন নিয়েছেন। জামিনে থাকা ব্যক্তিরা এবং জামিনের পর হুমকির বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে ঘটনার তদন্তে নেমেছে পুলিশ। আক্তার হত্যার ঘটনায় কারা জড়িত এবং কতজন ছিল, সে বিষয়ে ধারণা পাওয়া গেছে। ওই এলাকায় মাদক ও অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে চিরুনি অভিযান শুরু করেছে পুলিশ।’

বাবা-ছেলে হত্যায় একই ব্যক্তিরা জড়িত কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে পুলিশ সুপার বলেন, ‘আক্তার হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে আগের হত্যার যোগসূত্র আছে বলে আমরা মনে করছি। এর সঙ্গে আরও কোনও বিষয় আছে কি না, সেটিও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। প্রাথমিক তদন্তে বি কোম্পানির সদস্যরা জড়িত বলে ধারণা করছি। তবে পুরোপুরি নিশ্চিত হতে আরও কিছুটা সময় লাগবে। এখনও কাউকে গ্রেফতার করা যায়নি।’

তিন ঘণ্টার ব্যবধানে দুই যুবক খুন, সেখানেও জামিনের প্রশ্ন 

লবণচরা থানার আশিবিঘা এলাকায় গত ২১ আগস্ট তিন ঘণ্টার ব্যবধানে খুন হন দুই যুবক। সন্ধ্যায় মঞ্জুরুল ইসলাম (২২) হত্যার তিন ঘণ্টা পর প্রায় ৫০০ গজ দূরে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় উদ্ধার হয় নাজমুলের (১৮) লাশ। প্রথম ঘটনায় আশিবিঘা কালভার্টের কাছে মঞ্জুরুলকে লক্ষ্য করে হামলা চালায় একদল দুর্বৃত্ত।

পুলিশ বলছে, মঞ্জুরুলকে গুলি করার পাশাপাশি ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে হত্যা করা হয়। ওই দিন এই হত্যার তদন্তে পুলিশ যখন ব্যস্ত, তখনই রাত সাড়ে ৯টার দিকে একই এলাকায় দ্বিতীয় খুনের খবর আসে। একটি গলির মধ্যে পড়ে ছিল নাজমুলের লাশ। তার শরীরের ডান দিকে এবং পিঠের বাঁ দিকে গুলির চিহ্ন ছিল। ঘটনাস্থলের কাছ থেকে গুলির খোসাও উদ্ধার করা হয়। দুই ঘটনায় মামলা করেন নিহতের স্বজনরা।

খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের সহকারী পুলিশ কমিশনার (খুলনা জোন) মো. শফিকুল ইসলাম জানান, প্রাথমিকভাবে ফুটবল খেলাকে কেন্দ্র করে মঞ্জুরুল হত্যাকাণ্ড ঘটেছে বলে জানা গেছে। তবে শুধু ফুটবল খেলাকে কেন্দ্র করে ঘটনাটি ঘটেছে কি না, বিষয়টি আরও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। আশিবিঘা এলাকায় ‘সাইফি গ্রুপ’ ও ‘রাজু গ্রুপ’ নামে দুটি সন্ত্রাসী গ্রুপের তৎপরতা ও বিরোধের তথ্য পুলিশের কাছে রয়েছে। হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে কোনও গ্রুপের সম্পৃক্ততা আছে কিনা, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। কয়েক মাস আগে সাইফি গ্রুপের সাইফিকে গ্রেফতার করেছিল পুলিশ। পরে জামিনে মুক্ত হয়ে আবার অপরাধ কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে। জোড়া হত্যাকাণ্ডে সাইফির ভূমিকা ছিল কি না, সেটিও তদন্ত করছে পুলিশ।’

পুলিশ বলছে, একাধিক মামলায় অভিযুক্তরা গ্রেফতার হয়, আবার আদালতের মাধ্যমে জামিনে মুক্তও হয়। তারপর তাদের কেউ কেউ ফের অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। আলামিন হাসান সাইফ নামে এক আসামি খুলনা থানার তিনটি হত্যা মামলায় হাইকোর্ট থেকে জামিন পায়। হাইকোর্টের আদেশের পর খুলনা জেলা কারাগার থেকে তাকে মুক্তি দেওয়ার জন্য ছাড়পত্রও দেওয়া হয়েছিল। 

কেএমপির উপপুলিশ কমিশনার (সদর দফতর) এম এম শাকিলুজ্জামান বলেন, ‘অপরাধ কেবল পুলিশের শক্তি দিয়ে নির্মূল করা যায় না। অপরাধীর মনস্তত্ত্ব, পারিবারিক পরিবেশ, আর্থসামাজিক বাস্তবতা, শিক্ষা ও কর্মসংস্থান, সবই এর সঙ্গে জড়িত। পুলিশ বহু অপরাধীকে বার বার গ্রেফতার করছে, অস্ত্র-মাদক উদ্ধার করছে, মামলা তদন্ত করে আদালতে পাঠাচ্ছে। কিন্তু জামিনে মুক্তি পাওয়া বিচারিক প্রক্রিয়ার অংশ। কোনও কোনও ব্যক্তির বিরুদ্ধে ১০, ১৫, এমনকি ২০টি পর্যন্ত গ্রেফতারি পরোয়ানা রয়েছে। পুলিশ তাদের একাধিক বার গ্রেফতারও করেছে। তবু অপরাধ বন্ধ হচ্ছে না। এর মধ্যে আসামিরা জামিন পেয়ে যাচ্ছে।’

গ্রেফতার করে আসামিদের আদালতে পাঠালেই কি দায়িত্ব শেষ পুলিশের?

নাগরিক নেতা আইনজীবী মোহাম্মদ বাবুল হাওলাদার বলেন, ‘একই ব্যক্তি বারবার অপরাধে জড়ালে শুধু গ্রেফতার করে আদালতে পাঠালেই কি দায়িত্ব শেষ পুলিশের? উত্তর না। জামিনে বেরিয়ে আসার পর তার গতিবিধি নজরে রাখার ব্যবস্থা কোথায়? অপরাধ চক্রের অস্ত্র ও অর্থের জোগানদারদের বিরুদ্ধে কতটা ব্যবস্থা নিচ্ছে পুলিশ? মাদক সরবরাহের মূল শিকড়ে আঘাতই বা কতটা করতে পারছে?’ 

তিনি বলেন, ‘প্রতিটি ঘরে পুলিশ বসানো সম্ভব নয়; পুলিশের এই যুক্তি বাস্তব। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে অপরাধীচক্রকে সামাজিক ও প্রশাসনিক নজরদারির বাইরে থাকতে দেওয়া যায়। মাদক, অস্ত্র, আধিপত্য, জামিনে বের হওয়া ঝুঁকিপূর্ণ আসামি এবং অপরাধের অর্থের উৎস, সব কিছুকে একসঙ্গে নিশানায় না নিলে পরিস্থিতি বদলাবে না।’

বিষয় : মামলা হত্যাকাণ্ড গ্রেফতার জামিন

আপনার মতামত লিখুন

টিভি ২৬ নিউজ

বুধবার, ০৭ অক্টোবর ২০২৬


৭৩ হত্যাকাণ্ড: কীভাবে জামিন পাচ্ছে হত্যা মামলার আসামিরা, বাবা-ছেলের পর কে?

প্রকাশের তারিখ : ০৭ অক্টোবর ২০২৬

featured Image

খুলনায় একের পর এক হত্যা, গুলি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ ও নিরাপত্তাহীনতা বাড়ছে। অস্ত্রধারী ও বিভিন্ন হত্যা মামলার আসামিরা গ্রেফতার হয়ে অল্প সময়ের মধ্যে জামিনে বেরিয়ে আসছেন। এসব আসামি উচ্চ আদালত থেকে জামিনে বেরিয়ে অপরাধ ও হত্যাকাণ্ডে জড়াচ্ছেন। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত খুলনায় ৭৩ হত্যাকাণ্ড ঘটেছে, যা জনমনে আতঙ্ক বাড়িয়ে দিয়েছে। নগরীর বাসিন্দাদের কেউ কেউ বলছেন, এরপর কে? কারণ একদিন কিংবা দুদিন পরই ঘটছে হত্যাকাণ্ড। 

সবশেষ রূপসা উপজেলার আইচগাতি ইউনিয়নের দুর্জনীমহল গ্রামে আক্তার ঢালীকে গুলি করে হত্যার পর তার স্ত্রী নাসিমা বেগম আতঙ্কের কথা জানালেন। সেইসঙ্গে বলেছেন, ছেলে হত্যার আসামিরা জামিনে এসে বাবাকে মেরে ফেললো, জীবনের নিরাপত্তা চেয়ে থানায় জিডি করা হয়েছিল। কিন্তু পুলিশ তাকে বাঁচাতে পারলো না। ফলে আর মামলা করতে চান না। এমন কিছু ঘটার ভয়ে মুখ খোলারও সাহস করছেন না। 

পুলিশও বলছে, আসামিরা জামিনে বেরিয়ে ফের জড়াচ্ছে অপরাধে। তারা আরও ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করছে। প্রত্যেক ঘটনার পরই দুই-চার জন আসামিকে গ্রেফতার করা হয়। কিন্তু তারা দ্রুত জামিনে বেরিয়ে যায়।

এমন পরিস্থিতিতে খুলনায় বারবার হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন সচেতন নাগরিক ও সাধারণ মানুষজন। সম্প্রতি কয়েকটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা নিয়ে সমালোচনা হলেও অপরাধের পুনরাবৃত্তি ঠেকানো নিয়ে উদ্বেগ থেকেই যাচ্ছে। নগরবাসীর প্রশ্ন, একই ধরনের অপরাধে জড়িতদের গ্রেফতার করা হলেও তারা কীভাবে দ্রুত জামিনে বেরিয়ে যাচ্ছে।

একদিকে অপরাধীদের গ্রেফতার, অন্যদিকে জামিনে বেরিয়ে পুনরায় অপরাধে জড়িয়ে পড়া—এই দুইয়ের মধ্যে সমন্বিতভাবে কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে নগরীর নিরাপত্তা নিয়ে মানুষের উদ্বেগ আরও বাড়তে পারে বলে মনে করছেন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা।

মহানগরীতে ৩৮ হত্যাকাণ্ড

খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের (কেএমপি) দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাস থেকে এখন পর্যন্ত খুলনা মহানগরীতে ৩৮টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এসব ঘটনায় ২৩টি হত্যা মামলা হয়েছে। কারণ একাধিক হত্যার ঘটনায় একটি মামলা হওয়ায় মোট মামলার সংখ্যা ২৩টি। এসব মামলার মধ্যে পুলিশের হিসাবে ১৯টির রহস্য উদ্ঘাটন হয়েছে, গ্রেফতার হয়েছেন ৮১ জন। বাকিগুলোর তদন্ত চলছে। 

পুলিশ বলছে, রহস্য উদঘাটন হওয়া ১৯টি মামলার ১৭টি তদন্তাধীন এবং দুটি বিচারাধীন। এগুলোর ১৪টিতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি নেওয়া হয়েছে। তদন্তে দেখা যায়, নয়টি হত্যায় পারিবারিক ও ব্যক্তিগত বিরোধ, সাতটিতে মাদক ও আধিপত্য বিস্তার নিয়ে দ্বন্দ্ব, দুটিতে ইজিবাইক চুরি এবং একটি চোর সন্দেহে পিটুনির ঘটনা।

জেলায় ৩৫ হত্যাকাণ্ড

খুলনা জেলা পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত খুলনা জেলার নয়টি থানা এলাকায় ৩৫টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এসব ঘটনায় ৩৫টি মামলা হয়েছে। এগুলোর মধ্যে ২৫টির রহস্য উদঘাটন হয়েছে। এর মধ্যে নয়টি হত্যা ঘটেছে গুলিতে। পারিবারিক বিরোধে চারটি, শ্বাসরোধে দুটি, রাজনৈতিক কারণে দুটি, সামাজিক বিরোধে ১৩টি, কুপিয়ে তিনটি আর দুটি অজ্ঞাত কারণে। এর মধ্যে গুলিতে নয়টি ও কুপিয়ে তিনটি ঘটনার পেছনে রয়েছে মাদক, চুরি-ছিনতাই ও আধিপত্য বিস্তার।

হত্যা মামলার আসামিরা জামিনে বেরিয়ে হত্যাকাণ্ড ঘটাচ্ছে

সবমিলিয়ে জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। এর মধ্যে রূপসায় ছেলেকে হত্যার দেড় মাসের মাথায় বাবাকে হত্যার ঘটনাটি চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। ছেলে হত্যা মামলার আসামিরা উচ্চ আদালত থেকে জামিনে এসে বাবাকে হত্যা করেছেন বলে জানিয়েছেন স্বজনরা। এর আগে লবণচরায় তিন ঘণ্টার ব্যবধানে দুটি হত্যার পেছনেও জামিনে বেরিয়ে আসা অপরাধীর সংযোগের কথা জানিয়েছে পুলিশ। 

আতঙ্কে চুপ ভুক্তভোগীরা

খুনের পর শুধু একটি পরিবার নয়, গোটা এলাকার মানুষ আতঙ্কের মধ্যে ঢুকে পড়ছে। এ কারণে খুনের শিকার পরিবারগুলোও নির্বিকার হয়ে চুপ থাকছে। তারা মামলা করারও সাহস হারিয়ে ফেলছে। প্রতিবেশী, প্রত্যক্ষদর্শী, সাধারণ মানুষও ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে নীরবতা পালন করছে। 

তবু পুলিশ বলছে, ভুক্তভোগী ও সাধারণ মানুষকে মুখ খুলতে হবে, তথ্য দিতে হবে। কিন্তু যে মানুষটি তথ্য দেবেন, তার নিরাপত্তা কি নিশ্চিত হবে, সেই প্রশ্নেরও উত্তর দিতে পারছে না পুলিশ। যার প্রমাণ আক্তার ঢালী। ছেলেকে হত্যা মামলার আসামিরা জামিনে বেরিয়ে হুমকি দেওয়ার পর জীবনের নিরাপত্তা চেয়ে থানায় ১৫ দিন আগে জিডি করলেও তাকে বাঁচাতে পারেনি পুলিশ; এমনকি তার পরিবারকে নিরাপত্তা দিতে পারেনি।

নগরীর একাধিক বাসিন্দা জানিয়েছেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান ও গ্রেফতারের পর অভিযুক্তদের কেউ কেউ অল্প সময়ের মধ্যে কারাগার থেকে জামিনে বেরিয়ে আসায় মানুষের মধ্যে হতাশা তৈরি হচ্ছে। অপরাধীরা দ্রুত জামিনে বেরিয়ে আসার বিষয়টি আইনগত প্রক্রিয়ার অংশ হলেও হত্যা মামলার আসামিদের দ্রুত সময়ের মধ্যে জামিন পাওয়ার ঘটনা তাদের অসহায় করে তুলছে।

অপরাধীরা হত্যা করতে বিন্দুমাত্র চিন্তা করছে না

মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থা খুলনার সমন্বয়কারী অ্যাডভোকেট মোমিনুল ইসলাম বলেন, ‌‘সমাজে নৈতিকতার অবক্ষয় দেখা দিয়েছে। একজন মানুষের জীবন কেড়ে নিতে এখন অপরাধীরা বিন্দুমাত্র চিন্তা করছে না। পারিবারিক নৈতিক শিক্ষা ও অনুশাসনের অভাব এর অন্যতম কারণ। পরিবার থেকেই সন্তানদের নৈতিক শিক্ষা ও সামাজিক মূল্যবোধের চর্চা নিশ্চিত করতে হবে।’

একই কথা বলেছেন কেএমপির ডেপুটি পুলিশ কমিশনার (সদর) এম এম শাকিলুজ্জামান। তিনি বলেন, ‘সামাজিক অবক্ষয়ের কারণেই তরুণ সমাজের একটি অংশ অপরাধের দিকে ধাবিত হচ্ছে। আগে পাড়া-মহল্লায় মুরুব্বিদের কথা শোনা হতো। তারা অনেক সময় অশিক্ষিত হলেও এলাকায় সামাজিক শৃঙ্খলা বজায় রাখতেন। এখন সেই সামাজিক অনুশাসন অনেকটাই কমে গেছে। বর্তমানে মুরুব্বিদের সালাম দেওয়ার সংস্কৃতিও হারিয়ে গেছে। যুব সমাজকে সঠিক পথে রাখতে হলে প্রতিটি ঘরে ঘরে বাবা-মাকেই দায়িত্ব নিতে হবে। সামাজিক অনুশাসন মেনে চলতে হবে এবং আগের সামাজিক মূল্যবোধের জায়গায় ফিরে যেতে হবে। একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি মানুষের আস্থা ও বিশ্বাস রাখতে হবে।’

কীভাবে জামিন পাচ্ছেন হত্যা মামলার আসামিরা?

গত ১৫ আগস্ট সন্ধ্যায় দুর্জনীমহলের শহীদের মোড়ে ছেলে জয় ঢালীকে কুপিয়ে ও গলা কেটে হত্যা করা হয়। ওই ঘটনায় জয়ের মা নাসিমা বেগম বাদী হয়ে ১৩ জনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেন। মামলায় গ্রেফতার আসামিরা পরে উচ্চ আদালত থেকে জামিনে বেরিয়ে আসেন। তারা বাদীর স্বামী আক্তারকে ভয়ভীতি দেখিয়ে মামলা তুলে নিতে চাপ দেন। এরপর ৬ অক্টোবর বাড়ির সামনে আক্তার ঢালী নিহত হন। ছেলে হত্যা মামলার আসামিরা জামিনে বেরিয়ে এসে তার বাবাকে হত্যা করেছেন বলে জানান নাসিমা।

নাসিমা বেগম জানান, জয় ঢালী হত্যা মামলা নিয়ে চাপের মধ্যে ছিলেন বাবা আক্তার ঢালী। মামলা তুলে নিতে তাকে বলা হয়েছিল এবং প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়েছিল। হুমকির পর গত ২১ সেপ্টেম্বর রূপসা থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন আক্তার। কিন্তু আসামিরা কীভাবে জামিন পেলেন তা তার জানা নেই।

রূপসা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আনোয়ার জাহিদ বলেন, ‘জীবনের নিরাপত্তা চেয়ে আবেদনের দুদিন পর জিডিটি নথিভুক্ত করা হয়েছিল। রূপসা থানার জিডি নং-১৪১২ তাং-২৩/০৯/২৬।’

রূপসা থানায় করা জিডির আবেদনে আক্তার ঢালী উল্লেখ করেন, গত ১৮ সেপ্টেম্বর রাত পৌনে ৯টার দিকে সেনরেবাজার এলাকায় মামলার আসামি মুনজিল শেখ, মুরাদ শেখ, মাসুদ মোল্যা ও রোপা মোল্যা আমাকে ডেকে নিয়ে যান। তখন মামলা তুলে নেওয়ার জন্য বিভিন্ন ধরনের হুমকি-ধমকি দেন তারা। এমনকি জীবনে মেরে ফেলার হুমকি দেন। এ অবস্থায় আমি ঘটনাস্থল ত্যাগ করে চলে আসি।’ 

জিডিতে আক্তার ঢালী আরও লিখেন, ‘এর আগে একই আসামিরা আমার ছেলে জয় ঢালীকে দুর্জনীমহলের শহীদের মোড়ে কুপিয়ে হত্যা করেছিল। ওই মামলার আসামিরা হাইকোর্ট থেকে জামিনে এলাকায় এসে মামলা তুলে নেওয়ার জন্য আমিসহ আমার পরিবারের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। জানমালের ক্ষতি করবে বলে হুমকি দিতাছে। আসামিদের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে আমি ও আমার পরিবারবর্গ চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতেছি বিধায় আসামিদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণসহ আমার জীবনের নিরাপত্তার জন্য জিডি করছি।’

জামিনের পর হুমকির বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে তদন্তে পুলিশ

খুলনার পুলিশ সুপার সরকার ওমর ফারুক বলেন, ‘জয় ঢালী হত্যা মামলার আসামিরা উচ্চ আদালত থেকে জামিন নিয়েছেন। জামিনে থাকা ব্যক্তিরা এবং জামিনের পর হুমকির বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে ঘটনার তদন্তে নেমেছে পুলিশ। আক্তার হত্যার ঘটনায় কারা জড়িত এবং কতজন ছিল, সে বিষয়ে ধারণা পাওয়া গেছে। ওই এলাকায় মাদক ও অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে চিরুনি অভিযান শুরু করেছে পুলিশ।’

বাবা-ছেলে হত্যায় একই ব্যক্তিরা জড়িত কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে পুলিশ সুপার বলেন, ‘আক্তার হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে আগের হত্যার যোগসূত্র আছে বলে আমরা মনে করছি। এর সঙ্গে আরও কোনও বিষয় আছে কি না, সেটিও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। প্রাথমিক তদন্তে বি কোম্পানির সদস্যরা জড়িত বলে ধারণা করছি। তবে পুরোপুরি নিশ্চিত হতে আরও কিছুটা সময় লাগবে। এখনও কাউকে গ্রেফতার করা যায়নি।’

তিন ঘণ্টার ব্যবধানে দুই যুবক খুন, সেখানেও জামিনের প্রশ্ন 

লবণচরা থানার আশিবিঘা এলাকায় গত ২১ আগস্ট তিন ঘণ্টার ব্যবধানে খুন হন দুই যুবক। সন্ধ্যায় মঞ্জুরুল ইসলাম (২২) হত্যার তিন ঘণ্টা পর প্রায় ৫০০ গজ দূরে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় উদ্ধার হয় নাজমুলের (১৮) লাশ। প্রথম ঘটনায় আশিবিঘা কালভার্টের কাছে মঞ্জুরুলকে লক্ষ্য করে হামলা চালায় একদল দুর্বৃত্ত।

পুলিশ বলছে, মঞ্জুরুলকে গুলি করার পাশাপাশি ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে হত্যা করা হয়। ওই দিন এই হত্যার তদন্তে পুলিশ যখন ব্যস্ত, তখনই রাত সাড়ে ৯টার দিকে একই এলাকায় দ্বিতীয় খুনের খবর আসে। একটি গলির মধ্যে পড়ে ছিল নাজমুলের লাশ। তার শরীরের ডান দিকে এবং পিঠের বাঁ দিকে গুলির চিহ্ন ছিল। ঘটনাস্থলের কাছ থেকে গুলির খোসাও উদ্ধার করা হয়। দুই ঘটনায় মামলা করেন নিহতের স্বজনরা।

খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের সহকারী পুলিশ কমিশনার (খুলনা জোন) মো. শফিকুল ইসলাম জানান, প্রাথমিকভাবে ফুটবল খেলাকে কেন্দ্র করে মঞ্জুরুল হত্যাকাণ্ড ঘটেছে বলে জানা গেছে। তবে শুধু ফুটবল খেলাকে কেন্দ্র করে ঘটনাটি ঘটেছে কি না, বিষয়টি আরও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। আশিবিঘা এলাকায় ‘সাইফি গ্রুপ’ ও ‘রাজু গ্রুপ’ নামে দুটি সন্ত্রাসী গ্রুপের তৎপরতা ও বিরোধের তথ্য পুলিশের কাছে রয়েছে। হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে কোনও গ্রুপের সম্পৃক্ততা আছে কিনা, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। কয়েক মাস আগে সাইফি গ্রুপের সাইফিকে গ্রেফতার করেছিল পুলিশ। পরে জামিনে মুক্ত হয়ে আবার অপরাধ কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে। জোড়া হত্যাকাণ্ডে সাইফির ভূমিকা ছিল কি না, সেটিও তদন্ত করছে পুলিশ।’

পুলিশ বলছে, একাধিক মামলায় অভিযুক্তরা গ্রেফতার হয়, আবার আদালতের মাধ্যমে জামিনে মুক্তও হয়। তারপর তাদের কেউ কেউ ফের অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। আলামিন হাসান সাইফ নামে এক আসামি খুলনা থানার তিনটি হত্যা মামলায় হাইকোর্ট থেকে জামিন পায়। হাইকোর্টের আদেশের পর খুলনা জেলা কারাগার থেকে তাকে মুক্তি দেওয়ার জন্য ছাড়পত্রও দেওয়া হয়েছিল। 

কেএমপির উপপুলিশ কমিশনার (সদর দফতর) এম এম শাকিলুজ্জামান বলেন, ‘অপরাধ কেবল পুলিশের শক্তি দিয়ে নির্মূল করা যায় না। অপরাধীর মনস্তত্ত্ব, পারিবারিক পরিবেশ, আর্থসামাজিক বাস্তবতা, শিক্ষা ও কর্মসংস্থান, সবই এর সঙ্গে জড়িত। পুলিশ বহু অপরাধীকে বার বার গ্রেফতার করছে, অস্ত্র-মাদক উদ্ধার করছে, মামলা তদন্ত করে আদালতে পাঠাচ্ছে। কিন্তু জামিনে মুক্তি পাওয়া বিচারিক প্রক্রিয়ার অংশ। কোনও কোনও ব্যক্তির বিরুদ্ধে ১০, ১৫, এমনকি ২০টি পর্যন্ত গ্রেফতারি পরোয়ানা রয়েছে। পুলিশ তাদের একাধিক বার গ্রেফতারও করেছে। তবু অপরাধ বন্ধ হচ্ছে না। এর মধ্যে আসামিরা জামিন পেয়ে যাচ্ছে।’

গ্রেফতার করে আসামিদের আদালতে পাঠালেই কি দায়িত্ব শেষ পুলিশের?

নাগরিক নেতা আইনজীবী মোহাম্মদ বাবুল হাওলাদার বলেন, ‘একই ব্যক্তি বারবার অপরাধে জড়ালে শুধু গ্রেফতার করে আদালতে পাঠালেই কি দায়িত্ব শেষ পুলিশের? উত্তর না। জামিনে বেরিয়ে আসার পর তার গতিবিধি নজরে রাখার ব্যবস্থা কোথায়? অপরাধ চক্রের অস্ত্র ও অর্থের জোগানদারদের বিরুদ্ধে কতটা ব্যবস্থা নিচ্ছে পুলিশ? মাদক সরবরাহের মূল শিকড়ে আঘাতই বা কতটা করতে পারছে?’ 

তিনি বলেন, ‘প্রতিটি ঘরে পুলিশ বসানো সম্ভব নয়; পুলিশের এই যুক্তি বাস্তব। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে অপরাধীচক্রকে সামাজিক ও প্রশাসনিক নজরদারির বাইরে থাকতে দেওয়া যায়। মাদক, অস্ত্র, আধিপত্য, জামিনে বের হওয়া ঝুঁকিপূর্ণ আসামি এবং অপরাধের অর্থের উৎস, সব কিছুকে একসঙ্গে নিশানায় না নিলে পরিস্থিতি বদলাবে না।’


টিভি ২৬ নিউজ

সম্পাদক ও প্রকাশকঃ~ ফোরকানুল হক (সাকিব)

কপিরাইট © ২০২৬ টিভি ২৬ নিউজ । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত