সারাদেশে প্রতিনিধি নিয়োগ দিচ্ছে ফোরকানুল হক (সাকিব) সম্পাদিত " TV 26 NEWS " আগ্রহীরা দ্রুত যোগাযোগ করুন। সব খবর সবার আগে পেতে আমাদের সাথেই থাকুন। খুলনায় সাম্প্রতিক সময়ে একের পর এক হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক বিরাজ করছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত মহানগরীতে ৩৮ হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। যা গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। পাশাপাশি জেলার নয়টি থানা এলাকায় ঘটেছে আরও ৩৯ হত্যাকাণ্ড। সবমিলিয়ে ৭৭টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে জেলায়। এতে বোঝা যাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটেছে।
পুলিশের হিসাব অনুযায়ী, গত জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ১০ মাসে ৭১ জন নিহত হয়েছেন। হিসাবে প্রতি মাসে সাতজনের বেশি। এসব ঘটনায় ৬৯টি হত্যা মামলা হয়েছে। আর নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে খুনের ঘটনা ঘটেছে ছয়টি। সবমিলিয়ে এ পর্যন্ত হত্যাকাণ্ড ৭৭টিতে পৌঁছেছে। আইনশৃঙ্খলার এই অবনতি রোধে পুলিশ ও প্রশাসন তল্লাশি এবং অস্ত্র উদ্ধার অভিযান চালালেও হত্যাকাণ্ড থামানো চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বেশি খুন রূপসা থানা এলাকায়
জেলা ও মহানগরীতে গত ১০ মাসে ৭১টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এর মধ্যে জেলার নয় থানার মধ্যে দাকোপে হত্যাকাণ্ড ঘটেনি। অন্যদিকে ১২টি হত্যাকাণ্ড নিয়ে জেলার থানাগুলোর মধ্যে শীর্ষে রয়েছে রূপসা। মহানগরীতে আটটি থানা এলাকায় ৩৫টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এর মধ্যে আটটি খুন নিয়ে শীর্ষে সদর থানা।
পুলিশের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত খুলনা জেলায় ৩৬টি এবং মহানগরীতে ৩৫টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। মাসভিত্তিক হিসাবে জেলায় সবচেয়ে বেশি সাতটি খুন হয়েছে মার্চে। আর মহানগরীতে সর্বোচ্চ ছয়টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে সেপ্টেম্বরে। আবার নভেম্বরের প্রথম পাঁচ দিনেও জেলা ও মহানগরীতে তিনটি করে হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এগুলো হিসাব করলে এ পর্যন্ত হত্যাকাণ্ড দাঁড়িয়েছে ৭৭টিতে।
এ সময়ে জেলা ও মহানগরীতে ৭৮টি অস্ত্র উদ্ধার করেছে পুলিশ। এর মধ্যে জেলা পুলিশ উদ্ধার করেছে ২৬টি এবং মহানগর পুলিশ ৫২টি। এসব ঘটনায় আটক হয়েছেন ১৮৭ জন। তাদের মধ্যে জেলা পুলিশের হাতে ২৯ জন এবং মহানগর পুলিশের হাতে ১৫৮ জন। মহানগরীতে আটক ব্যক্তিদের মধ্যে ৪৩ জন আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।
এত হত্যাকাণ্ডের কারণ কী
পুলিশের ভাষ্যমতে, চাঁদাবাজি, আধিপত্য বিস্তার, মাদক ব্যবসা নিয়ে অভ্যন্তরীণ কোন্দল, ছিনতাই, পূর্বশত্রুতা এবং রাজনৈতিক ও স্থানীয় সন্ত্রাসী গ্রুপের মধ্যকার বিরোধকে সামনে আনছে পুলিশ।
আলোচনায় নয়টি সন্ত্রাসী গ্রুপ
খুলনায় সাম্প্রতিক সময়ে অপরাধের বেশির ভাগ ঘটনায় ঘুরেফিরে নয়টি সন্ত্রাসী গ্রুপের নাম এসেছে। তারা এতটাই বেপরোয়া যে জনবহুল এলাকাতেও প্রকাশ্যে গুলি করতে দ্বিধা করছে না।
পুলিশের একাধিক সূত্র বলছে, খুলনায় সক্রিয় অপরাধী গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে রয়েছে রনি চৌধুরী ওরফে গ্রেনেড বাবুর বি কোম্পানি, শেখ পলাশের পলাশ গ্রুপ, নূর আজিম গ্রুপ, আশিক বাহিনী, হুমায়ুন কবিরের হুমা বাহিনী, শেখ সাইদুর রহমান ওরফে শাওনের টেংকি শাওন গ্রুপ, আরমান শেখের আরমান গ্রুপ, শাকিল শেখের শাকিল গ্রুপ এবং নাসিম গ্রুপ।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্রগুলো বলছে, পুরো খুলনা শহরেই বাবু গ্রুপের আধিপত্য রয়েছে। নূর আজিম ও আশিক গ্রুপের আধিপত্য খুলনা সদর ও লবণচরা থানা এলাকায়। শাওন গ্রুপ সক্রিয় সোনাডাঙ্গা ও খালিশপুরে, আরমান গ্রুপ ও হুমা বাহিনীর আধিপত্য দৌলতপুর ও খানজাহান আলী থানা এলাকায়। আর নাসিম গ্রুপের প্রধান নাসিমুল গণিকে ৪ অক্টোবর দিঘলিয়া উপজেলায় গুলি করে হত্যা করা হয়। খুলনা সদর, লবণচরা ও হরিণটানা এলাকায় গত কয়েক মাসে গুলি ও হত্যার ঘটনা বেশি ঘটেছে।
অন্যদিকে খুলনা জেলা পুলিশের উচ্চপর্যায়ের একাধিক সূত্র বলছে, দিঘলিয়া, আড়ংঘাটা, কয়রা, পাইকগাছা ও ডুমুরিয়ায় ছোট ছোট সশস্ত্র গোষ্ঠী সক্রিয় রয়েছে। এসব গোষ্ঠীর কারও কারও বিরুদ্ধে মাদক ও অস্ত্র কারবারে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় আধিপত্য, জমি, ঘের, বালুর ব্যবসা, পরিবহন ও ঠিকাদারি কাজের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে এসব গোষ্ঠী প্রায়ই বিরোধে জড়ায়।
১০ মাসে ৯টি থানা এলাকায় ৩৬টি হত্যাকাণ্ড
খুলনা জেলা পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত জেলার নয়টি থানা এলাকায় ৩৬টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ৩৬টি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় ৫১ জনের নাম উল্লেখ করে ৭৬ থেকে ৭৭ জনকে আসামি করা হয়েছে। গ্রেফতার হয়েছেন ২৯ জন। মার্চে সবচেয়ে বেশি সাতটি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এ ছাড়া জুলাইয়ে পাঁচটি, জানুয়ারি, এপ্রিল ও সেপ্টেম্বরে চারটি করে, মে ও অক্টোবরে তিনটি করে এবং ফেব্রুয়ারি, জুন ও আগস্টে দুটি করে হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এ ছাড়া নভেম্বরের প্রথম পাঁচ দিনেও তিনটি হত্যাকাণ্ড হয়েছে। সবমিলিয়ে চলতি বছরের এ পর্যন্ত (৮ নভেম্বর) জেলায় ৩৯টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে।
থানাভিত্তিক হিসাবে রূপসায় সবচেয়ে বেশি ১২ জন নিহত হয়েছেন। পাশাপাশি দিঘলিয়ায় পাঁচজন, পাইকগাছায় পাঁচজন, কয়রায় পাঁচজন, তেরখাদায় দুজন, ডুমুরিয়ায় তিনজন, বটিয়াঘাটায় তিনজন এবং ফুলতলায় একজন নিহত হয়েছেন। তবে দাকোপে কোনও হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেনি।
জেলা পুলিশ জানায়, এই সময়ে বিভিন্ন অভিযানে সাতটি একনলা বন্দুক, সাতটি পাইপগান, একটি দোনলা বন্দুক, পাঁচটি ওয়ান শুটারগান, পাঁচটি পিস্তল ও একটি রিভলভার উদ্ধার করা হয়েছে। এ ছাড়া ৭৫ রাউন্ড বন্দুকের কার্তুজ, ১০টি কার্তুজের খোসা, দুটি ম্যাগাজিন, দুই রাউন্ড লেট বুলেট, ৬০ রাউন্ড গুলি, একটি চাপাতি, একটি লোহার হাতুড়ি, চাইনিজ কুড়ালসদৃশ পাঁচটি লোহার বস্তু, একটি ধারালো হাসুয়া, সাতটি কাঠের হকিস্টিক ও একটি পুরোনো রামদা উদ্ধার করা হয়েছে। এসব ঘটনায় ১৯টি মামলায় ৩৯ জনকে আসামি করা হয়েছে।
জেলা পুলিশের হিসাবে, খুলনায় ২০২১ সালে ৩০টি, ২০২২ সালে ২২টি, ২০২৩ সালে ২১টি, ২০২৪ সালে ৩১টি এবং ২০২৫ সালে ৪৯টি হত্যা মামলা হয়েছিল।
মহানগরীতে ১০ মাসে ৩৫ খুন
খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের (কেএমপি) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম ১০ মাসে মহানগরীর আটটি থানা এলাকায় ৩৫টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ৩৫টি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় ৩৭ জনকে আসামি করা হয়েছে। গ্রেফতার হয়েছেন ১৫৮ জন। তাদের মধ্যে ৪৩ জন আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন।
কেএমপির হিসাবে, ৩৫টি হত্যাকাণ্ডের মধ্যে ৩২টির রহস্য উদঘাটন করা হয়েছে। বাকি তিনটির রহস্য এখনও উদঘাটন হয়নি। এ পর্যন্ত সাতটি মামলার নিষ্পত্তি হয়েছে; তদন্তাধীন রয়েছে ২৮টি।
হত্যাকাণ্ডগুলোর কারণ বিশ্লেষণে কেএমপি জানিয়েছে, মাদক ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে ১৩টি, পারিবারিক ও ব্যক্তিগত কারণে ১১টি, চোর সন্দেহে তিনটি, ইজিবাইক চুরির ঘটনায় দুটি, ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনিতে একটি এবং বাড়িভাড়াকে কেন্দ্র করে একটি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এ ছাড়া চারটি হত্যাকাণ্ডের কারণ অজ্ঞাত। এর মধ্যে দুটি মরদেহ নদীতে ভাসমান অবস্থায় পাওয়া যায়। তা ছাড়া ১৪টি হত্যাকাণ্ডে আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে।
মাসভিত্তিক হিসাবে সেপ্টেম্বরে সবচেয়ে বেশি ছয়টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। আগস্টে পাঁচটি, ফেব্রুয়ারি, মার্চ ও অক্টোবরে চারটি করে, মে, জুন ও জুলাইয়ে তিনটি করে, এপ্রিলে দুটি এবং জানুয়ারিতে একটি হত্যাকাণ্ড ঘটে। নভেম্বরের প্রথম পাঁচ দিনেও মহানগরীতে তিনটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে একটি ঘটনাকে আত্মহত্যা বলে ধারণা করা হলেও তদন্ত চলছে। সবমিলিয়ে চলতি বছরের এ পর্যন্ত (৮ নভেম্বর) মহানগরীতে ৩৮টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে।
থানাভিত্তিক হিসাবে খুলনা সদর থানায় সবচেয়ে বেশি আটটি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। লবণচরা থানায় সাতটি, দৌলতপুরে পাঁচটি, আড়ংঘাটায় চারটি, সোনাডাঙ্গা মডেল, হরিণটানা ও খালিশপুর থানায় তিনটি করে এবং খানজাহান আলী থানায় দুটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে।
এ ছাড়া ১০ মাসে মহানগরীর আটটি থানায় বিভিন্ন অপরাধে মোট ১ হাজার ২৮৫টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে খুনের মামলা ৩৫টি, ধর্ষণ ২৫টি, নারী ও শিশু নির্যাতন ৮১টি, অপহরণ ১১টি, পুলিশের ওপর হামলা সাতটি, সিঁধেল চুরি ২৬টি, গাড়িসহ অন্যান্য চুরি ১৩১টি, সড়ক দুর্ঘটনা ১৭টি, দস্যুতা ২৭টি, দ্রুত বিচার আইনে পাঁচটি, ডাকাতি চারটি এবং দাঙ্গার ঘটনায় একটি মামলা হয়েছে। অন্যান্য অপরাধে মামলা হয়েছে ৩৫৭টি। এ ছাড়া দেশি-বিদেশি ৫২টি অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনায় ৪৮টি মামলা হয়েছে।
মাসভিত্তিক হিসাবে মে ও জুনে সবচেয়ে বেশি ১৪৯টি করে মামলা হয়েছে। সেপ্টেম্বরে ১৪৫টি, অক্টোবরে ১৪৩টি, জুলাইয়ে ১৩৮টি, আগস্টে ১৩৬টি, জানুয়ারিতে ১১৫টি, এপ্রিলে ১১৪টি এবং মার্চে ১০৫টি মামলা হয়েছে। ফেব্রুয়ারিতে সবচেয়ে কম ৯১টি মামলা হয়েছে।
কেএমপির হিসাবে, মহানগরীতে ২০২১ সালে ১৫টি, ২০২২ সালে ১৯টি, ২০২৩ সালে ১৭টি, ২০২৪ সালে ২৯টি এবং ২০২৫ সালে ৩৪টি হত্যা মামলা হয়েছিল। এবার ১০ মাসেই ঘটেছে ৩৯ হত্যাকাণ্ড।
রূপসায় একের পর এক খুন
জেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে রূপসায়। সর্বশেষ ২ নভেম্বর দুপুরে উপজেলার আইচগাতী ইউনিয়নের সিংহের চর এলাকায় আঠারোবেকি নদীর চর থেকে মেহেদী হাসান সোহাগ (৩৫) ও রেজাউল করিম (৩০) নামের দুই যুবকের গুলিবিদ্ধ মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। সোহাগ রূপসার আইচগাতী এলাকায় বসবাস করতেন। তিনি ঝালকাঠির রাজাপুর গ্রামের আবদুল্লাহর ছেলে।
পুলিশের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, নিহত দুজন খুলনার অপরাধজগতের বি কোম্পানি গ্রুপের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তাদের শরীরে গভীর ক্ষত ও গুলির চিহ্ন পাওয়া গেছে। অভ্যন্তরীণ বিরোধের জেরে অন্য কোথাও তাদের হত্যার পর মরদেহ নদীতে ফেলে দেওয়া হয়। পরে জোয়ার-ভাটার টানে মরদেহ দুটি আঠারোবেকি নদীর চরে আটকে পড়ে।
গত ৫ অক্টোবর সন্ধ্যায় আইচগাতী ইউনিয়নের দুর্জনিমহল গ্রামে নিজ বাড়ির সামনে রাস্তার পাশে বসে থাকা আক্তার ঢালী (৬৪) নামের এক বৃদ্ধকে গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। এর ৫১ দিন আগে গত ১৫ আগস্ট রাত সোয়া ৯টার দিকে একই এলাকার আবদুর রাজ্জাকের মোড়ে তার ছেলে জয় ঢালীকে (২৭) কুপিয়ে ও গলা কেটে হত্যা করা হয়।
স্থানীয় সূত্রের ভাষ্য, অপরাধী চক্রের অভ্যন্তরীণ বিরোধ ও এলাকায় প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে জয়কে হত্যা করা হয়েছিল। আক্তার ঢালীর হত্যাকাণ্ডের পেছনে ছেলের হত্যা মামলার আইনি প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করার উদ্দেশ্য ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।
গত ১১ আগস্ট রাতে উপজেলার নৈহাটি ইউনিয়নের রূপসা ব্রিকস নামের একটি ইটভাটায় ঢুকে যুবদল কর্মী ফখরুল শেখকে (৩২) গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। তিনি নৈহাটি গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন এবং ইটভাটাটিতে পাহারার দায়িত্বে ছিলেন। পূর্বশত্রুতা ও স্থানীয় বালুমহালের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধের জেরে এ হত্যাকাণ্ড ঘটে।
আঠারোবেকি নদী থেকে দুই যুবকের মরদেহ উদ্ধারের পর রূপসার রাজাপুর, নৈহাটি ও আইচগাতী এলাকার বাসিন্দা এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা নিরাপত্তাহীনতার কথা জানিয়েছেন। তাদের ভাষ্য, একের পর এক হত্যাকাণ্ডের কারণে সন্ধ্যার পর ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান খোলা রাখা কিংবা রাস্তায় বের হতেও ভয় পাচ্ছেন তারা। মাদক ও অপরাধী চক্র নির্মূল করে স্বাভাবিক জীবনযাপনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তারা।
রূপসার সচেতন বাসিন্দাদের মতে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চলমান অভিযান আরও জোরদার করা প্রয়োজন। তারা এলাকায় সন্ত্রাস ও অপরাধ দমনে কার্যকর পদক্ষেপ চান।
রূপসা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাসুম খান বলেন, আঠারোবেকি নদী থেকে উদ্ধার হওয়া দুই যুবকের শরীরে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। পুলিশ সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে ঘটনাটি তদন্ত করছে। অপরাধে জড়িত চক্রগুলোকে শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে পুলিশ ও গোয়েন্দা দল অভিযান চালাচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রীর সফরের দিন ডুমুরিয়ায় গুলি করে হত্যা
গত ৫ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের খুলনা সফরের দিন ডুমুরিয়ায় দুর্বৃত্তদের গুলিতে তরিকুল ইসলাম (৩৫) নামের এক ঘের ব্যবসায়ী নিহত হন। দুপুর পৌনে ২টার দিকে উপজেলার ১২ নম্বর রংপুর ইউনিয়নের আমভিটা-রামকৃষ্ণপুর জোড়া বটতলা এলাকায় গফফার সানার চায়ের দোকানে এ ঘটনা ঘটে। তরিকুল ওই ইউনিয়ন বিএনপির আহ্বায়ক শেখ আবদুস সালামের ছেলে।
পুলিশ, প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, শাওন নামের এক ব্যক্তিকে সঙ্গে নিয়ে লিজ নেওয়া ঘের থেকে বের হয়ে চায়ের দোকানে বসে চা পান করছিলেন তরিকুল। এ সময় হেলমেট ও মাস্ক পরা কয়েকজন দুর্বৃত্ত মোটরসাইকেলে এসে দোকানে ঢোকে। তারা খুব কাছ থেকে তরিকুলের মাথায় গুলি করে। গুলির শব্দে স্থানীয় লোকজন আতঙ্কে ছোটাছুটি শুরু করেন। এরপর মোটরসাইকেলে করে খুলনা-দৌলতপুর সড়কের দিকে পালিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা। গুলিতে ঘটনাস্থলেই তরিকুলের মৃত্যু হয়।
খবর পেয়ে ডুমুরিয়া থানা-পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে এবং এলাকা ঘিরে রাখে। ডুমুরিয়া থানার ওসি খন্দকার হাফিজুর রহমান বলেন, ‘হত্যাকাণ্ডের কারণ অনুসন্ধানে তদন্ত শুরু হয়েছে। জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত ও গ্রেফতারে অভিযান চলছে। এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।’
সমন্বিত টহল ও তল্লাশির পরিকল্পনা
খুলনা জেলার পুলিশ সুপার ওমর ফারুক বলেন, ‘সন্ত্রাস দমনে জেলা পুলিশ কঠোর অবস্থানে আছে। পরিস্থিতির উন্নয়নে বিশেষ অভিযান চালানো হচ্ছে। থানাগুলোর সীমান্তবর্তী এলাকায় টহল জোরদার এবং সমন্বিত চেকপোস্ট বসানোর পরিকল্পনা রয়েছে। মোটরসাইকেল তল্লাশির আওতাও বাড়ানো হবে।’
তিনি বলেন, ‘অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীরা দুর্গম ও সরু সড়ক দিয়ে মোটরসাইকেলে দ্রুত পালিয়ে যায়। এক থানার এলাকায় অপরাধ করে অন্য থানায় চলে যাওয়ার ঘটনাও ঘটে। এ কারণে বিভিন্ন থানার মধ্যে সমন্বয় করে অভিযান চালানোর পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে।’
কেএমপির কমিশনার মো. সাজ্জাদ হোসেন বলেন, ‘খুলনার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে পুলিশ শক্ত অবস্থান নিয়েছে। অধিকাংশ হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটন করা হয়েছে এবং বেশির ভাগ আসামিকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। মাদক ও অপরাধের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে গোয়েন্দা নজরদারি চলছে।’
তিনি বলেন, ‘অপরাধীরা অস্ত্র নিয়ে চলাচলে মোটরসাইকেল ব্যবহার করছে। গলিপথ দিয়ে দ্রুত পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকায় মোটরসাইকেলকে সন্দেহের তালিকায় রেখে তল্লাশি চালানো হচ্ছে।’
বিষয় : পুলিশ হত্যাকাণ্ড আইনশৃঙ্খলা

সোমবার, ০৯ নভেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৮ নভেম্বর ২০২৬
খুলনায় সাম্প্রতিক সময়ে একের পর এক হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক বিরাজ করছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত মহানগরীতে ৩৮ হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। যা গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। পাশাপাশি জেলার নয়টি থানা এলাকায় ঘটেছে আরও ৩৯ হত্যাকাণ্ড। সবমিলিয়ে ৭৭টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে জেলায়। এতে বোঝা যাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটেছে।
পুলিশের হিসাব অনুযায়ী, গত জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ১০ মাসে ৭১ জন নিহত হয়েছেন। হিসাবে প্রতি মাসে সাতজনের বেশি। এসব ঘটনায় ৬৯টি হত্যা মামলা হয়েছে। আর নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে খুনের ঘটনা ঘটেছে ছয়টি। সবমিলিয়ে এ পর্যন্ত হত্যাকাণ্ড ৭৭টিতে পৌঁছেছে। আইনশৃঙ্খলার এই অবনতি রোধে পুলিশ ও প্রশাসন তল্লাশি এবং অস্ত্র উদ্ধার অভিযান চালালেও হত্যাকাণ্ড থামানো চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বেশি খুন রূপসা থানা এলাকায়
জেলা ও মহানগরীতে গত ১০ মাসে ৭১টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এর মধ্যে জেলার নয় থানার মধ্যে দাকোপে হত্যাকাণ্ড ঘটেনি। অন্যদিকে ১২টি হত্যাকাণ্ড নিয়ে জেলার থানাগুলোর মধ্যে শীর্ষে রয়েছে রূপসা। মহানগরীতে আটটি থানা এলাকায় ৩৫টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এর মধ্যে আটটি খুন নিয়ে শীর্ষে সদর থানা।
পুলিশের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত খুলনা জেলায় ৩৬টি এবং মহানগরীতে ৩৫টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। মাসভিত্তিক হিসাবে জেলায় সবচেয়ে বেশি সাতটি খুন হয়েছে মার্চে। আর মহানগরীতে সর্বোচ্চ ছয়টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে সেপ্টেম্বরে। আবার নভেম্বরের প্রথম পাঁচ দিনেও জেলা ও মহানগরীতে তিনটি করে হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এগুলো হিসাব করলে এ পর্যন্ত হত্যাকাণ্ড দাঁড়িয়েছে ৭৭টিতে।
এ সময়ে জেলা ও মহানগরীতে ৭৮টি অস্ত্র উদ্ধার করেছে পুলিশ। এর মধ্যে জেলা পুলিশ উদ্ধার করেছে ২৬টি এবং মহানগর পুলিশ ৫২টি। এসব ঘটনায় আটক হয়েছেন ১৮৭ জন। তাদের মধ্যে জেলা পুলিশের হাতে ২৯ জন এবং মহানগর পুলিশের হাতে ১৫৮ জন। মহানগরীতে আটক ব্যক্তিদের মধ্যে ৪৩ জন আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।
এত হত্যাকাণ্ডের কারণ কী
পুলিশের ভাষ্যমতে, চাঁদাবাজি, আধিপত্য বিস্তার, মাদক ব্যবসা নিয়ে অভ্যন্তরীণ কোন্দল, ছিনতাই, পূর্বশত্রুতা এবং রাজনৈতিক ও স্থানীয় সন্ত্রাসী গ্রুপের মধ্যকার বিরোধকে সামনে আনছে পুলিশ।
আলোচনায় নয়টি সন্ত্রাসী গ্রুপ
খুলনায় সাম্প্রতিক সময়ে অপরাধের বেশির ভাগ ঘটনায় ঘুরেফিরে নয়টি সন্ত্রাসী গ্রুপের নাম এসেছে। তারা এতটাই বেপরোয়া যে জনবহুল এলাকাতেও প্রকাশ্যে গুলি করতে দ্বিধা করছে না।
পুলিশের একাধিক সূত্র বলছে, খুলনায় সক্রিয় অপরাধী গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে রয়েছে রনি চৌধুরী ওরফে গ্রেনেড বাবুর বি কোম্পানি, শেখ পলাশের পলাশ গ্রুপ, নূর আজিম গ্রুপ, আশিক বাহিনী, হুমায়ুন কবিরের হুমা বাহিনী, শেখ সাইদুর রহমান ওরফে শাওনের টেংকি শাওন গ্রুপ, আরমান শেখের আরমান গ্রুপ, শাকিল শেখের শাকিল গ্রুপ এবং নাসিম গ্রুপ।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্রগুলো বলছে, পুরো খুলনা শহরেই বাবু গ্রুপের আধিপত্য রয়েছে। নূর আজিম ও আশিক গ্রুপের আধিপত্য খুলনা সদর ও লবণচরা থানা এলাকায়। শাওন গ্রুপ সক্রিয় সোনাডাঙ্গা ও খালিশপুরে, আরমান গ্রুপ ও হুমা বাহিনীর আধিপত্য দৌলতপুর ও খানজাহান আলী থানা এলাকায়। আর নাসিম গ্রুপের প্রধান নাসিমুল গণিকে ৪ অক্টোবর দিঘলিয়া উপজেলায় গুলি করে হত্যা করা হয়। খুলনা সদর, লবণচরা ও হরিণটানা এলাকায় গত কয়েক মাসে গুলি ও হত্যার ঘটনা বেশি ঘটেছে।
অন্যদিকে খুলনা জেলা পুলিশের উচ্চপর্যায়ের একাধিক সূত্র বলছে, দিঘলিয়া, আড়ংঘাটা, কয়রা, পাইকগাছা ও ডুমুরিয়ায় ছোট ছোট সশস্ত্র গোষ্ঠী সক্রিয় রয়েছে। এসব গোষ্ঠীর কারও কারও বিরুদ্ধে মাদক ও অস্ত্র কারবারে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় আধিপত্য, জমি, ঘের, বালুর ব্যবসা, পরিবহন ও ঠিকাদারি কাজের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে এসব গোষ্ঠী প্রায়ই বিরোধে জড়ায়।
১০ মাসে ৯টি থানা এলাকায় ৩৬টি হত্যাকাণ্ড
খুলনা জেলা পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত জেলার নয়টি থানা এলাকায় ৩৬টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ৩৬টি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় ৫১ জনের নাম উল্লেখ করে ৭৬ থেকে ৭৭ জনকে আসামি করা হয়েছে। গ্রেফতার হয়েছেন ২৯ জন। মার্চে সবচেয়ে বেশি সাতটি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এ ছাড়া জুলাইয়ে পাঁচটি, জানুয়ারি, এপ্রিল ও সেপ্টেম্বরে চারটি করে, মে ও অক্টোবরে তিনটি করে এবং ফেব্রুয়ারি, জুন ও আগস্টে দুটি করে হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এ ছাড়া নভেম্বরের প্রথম পাঁচ দিনেও তিনটি হত্যাকাণ্ড হয়েছে। সবমিলিয়ে চলতি বছরের এ পর্যন্ত (৮ নভেম্বর) জেলায় ৩৯টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে।
থানাভিত্তিক হিসাবে রূপসায় সবচেয়ে বেশি ১২ জন নিহত হয়েছেন। পাশাপাশি দিঘলিয়ায় পাঁচজন, পাইকগাছায় পাঁচজন, কয়রায় পাঁচজন, তেরখাদায় দুজন, ডুমুরিয়ায় তিনজন, বটিয়াঘাটায় তিনজন এবং ফুলতলায় একজন নিহত হয়েছেন। তবে দাকোপে কোনও হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেনি।
জেলা পুলিশ জানায়, এই সময়ে বিভিন্ন অভিযানে সাতটি একনলা বন্দুক, সাতটি পাইপগান, একটি দোনলা বন্দুক, পাঁচটি ওয়ান শুটারগান, পাঁচটি পিস্তল ও একটি রিভলভার উদ্ধার করা হয়েছে। এ ছাড়া ৭৫ রাউন্ড বন্দুকের কার্তুজ, ১০টি কার্তুজের খোসা, দুটি ম্যাগাজিন, দুই রাউন্ড লেট বুলেট, ৬০ রাউন্ড গুলি, একটি চাপাতি, একটি লোহার হাতুড়ি, চাইনিজ কুড়ালসদৃশ পাঁচটি লোহার বস্তু, একটি ধারালো হাসুয়া, সাতটি কাঠের হকিস্টিক ও একটি পুরোনো রামদা উদ্ধার করা হয়েছে। এসব ঘটনায় ১৯টি মামলায় ৩৯ জনকে আসামি করা হয়েছে।
জেলা পুলিশের হিসাবে, খুলনায় ২০২১ সালে ৩০টি, ২০২২ সালে ২২টি, ২০২৩ সালে ২১টি, ২০২৪ সালে ৩১টি এবং ২০২৫ সালে ৪৯টি হত্যা মামলা হয়েছিল।
মহানগরীতে ১০ মাসে ৩৫ খুন
খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের (কেএমপি) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম ১০ মাসে মহানগরীর আটটি থানা এলাকায় ৩৫টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ৩৫টি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় ৩৭ জনকে আসামি করা হয়েছে। গ্রেফতার হয়েছেন ১৫৮ জন। তাদের মধ্যে ৪৩ জন আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন।
কেএমপির হিসাবে, ৩৫টি হত্যাকাণ্ডের মধ্যে ৩২টির রহস্য উদঘাটন করা হয়েছে। বাকি তিনটির রহস্য এখনও উদঘাটন হয়নি। এ পর্যন্ত সাতটি মামলার নিষ্পত্তি হয়েছে; তদন্তাধীন রয়েছে ২৮টি।
হত্যাকাণ্ডগুলোর কারণ বিশ্লেষণে কেএমপি জানিয়েছে, মাদক ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে ১৩টি, পারিবারিক ও ব্যক্তিগত কারণে ১১টি, চোর সন্দেহে তিনটি, ইজিবাইক চুরির ঘটনায় দুটি, ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনিতে একটি এবং বাড়িভাড়াকে কেন্দ্র করে একটি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এ ছাড়া চারটি হত্যাকাণ্ডের কারণ অজ্ঞাত। এর মধ্যে দুটি মরদেহ নদীতে ভাসমান অবস্থায় পাওয়া যায়। তা ছাড়া ১৪টি হত্যাকাণ্ডে আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে।
মাসভিত্তিক হিসাবে সেপ্টেম্বরে সবচেয়ে বেশি ছয়টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। আগস্টে পাঁচটি, ফেব্রুয়ারি, মার্চ ও অক্টোবরে চারটি করে, মে, জুন ও জুলাইয়ে তিনটি করে, এপ্রিলে দুটি এবং জানুয়ারিতে একটি হত্যাকাণ্ড ঘটে। নভেম্বরের প্রথম পাঁচ দিনেও মহানগরীতে তিনটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে একটি ঘটনাকে আত্মহত্যা বলে ধারণা করা হলেও তদন্ত চলছে। সবমিলিয়ে চলতি বছরের এ পর্যন্ত (৮ নভেম্বর) মহানগরীতে ৩৮টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে।
থানাভিত্তিক হিসাবে খুলনা সদর থানায় সবচেয়ে বেশি আটটি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। লবণচরা থানায় সাতটি, দৌলতপুরে পাঁচটি, আড়ংঘাটায় চারটি, সোনাডাঙ্গা মডেল, হরিণটানা ও খালিশপুর থানায় তিনটি করে এবং খানজাহান আলী থানায় দুটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে।
এ ছাড়া ১০ মাসে মহানগরীর আটটি থানায় বিভিন্ন অপরাধে মোট ১ হাজার ২৮৫টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে খুনের মামলা ৩৫টি, ধর্ষণ ২৫টি, নারী ও শিশু নির্যাতন ৮১টি, অপহরণ ১১টি, পুলিশের ওপর হামলা সাতটি, সিঁধেল চুরি ২৬টি, গাড়িসহ অন্যান্য চুরি ১৩১টি, সড়ক দুর্ঘটনা ১৭টি, দস্যুতা ২৭টি, দ্রুত বিচার আইনে পাঁচটি, ডাকাতি চারটি এবং দাঙ্গার ঘটনায় একটি মামলা হয়েছে। অন্যান্য অপরাধে মামলা হয়েছে ৩৫৭টি। এ ছাড়া দেশি-বিদেশি ৫২টি অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনায় ৪৮টি মামলা হয়েছে।
মাসভিত্তিক হিসাবে মে ও জুনে সবচেয়ে বেশি ১৪৯টি করে মামলা হয়েছে। সেপ্টেম্বরে ১৪৫টি, অক্টোবরে ১৪৩টি, জুলাইয়ে ১৩৮টি, আগস্টে ১৩৬টি, জানুয়ারিতে ১১৫টি, এপ্রিলে ১১৪টি এবং মার্চে ১০৫টি মামলা হয়েছে। ফেব্রুয়ারিতে সবচেয়ে কম ৯১টি মামলা হয়েছে।
কেএমপির হিসাবে, মহানগরীতে ২০২১ সালে ১৫টি, ২০২২ সালে ১৯টি, ২০২৩ সালে ১৭টি, ২০২৪ সালে ২৯টি এবং ২০২৫ সালে ৩৪টি হত্যা মামলা হয়েছিল। এবার ১০ মাসেই ঘটেছে ৩৯ হত্যাকাণ্ড।
রূপসায় একের পর এক খুন
জেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে রূপসায়। সর্বশেষ ২ নভেম্বর দুপুরে উপজেলার আইচগাতী ইউনিয়নের সিংহের চর এলাকায় আঠারোবেকি নদীর চর থেকে মেহেদী হাসান সোহাগ (৩৫) ও রেজাউল করিম (৩০) নামের দুই যুবকের গুলিবিদ্ধ মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। সোহাগ রূপসার আইচগাতী এলাকায় বসবাস করতেন। তিনি ঝালকাঠির রাজাপুর গ্রামের আবদুল্লাহর ছেলে।
পুলিশের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, নিহত দুজন খুলনার অপরাধজগতের বি কোম্পানি গ্রুপের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তাদের শরীরে গভীর ক্ষত ও গুলির চিহ্ন পাওয়া গেছে। অভ্যন্তরীণ বিরোধের জেরে অন্য কোথাও তাদের হত্যার পর মরদেহ নদীতে ফেলে দেওয়া হয়। পরে জোয়ার-ভাটার টানে মরদেহ দুটি আঠারোবেকি নদীর চরে আটকে পড়ে।
গত ৫ অক্টোবর সন্ধ্যায় আইচগাতী ইউনিয়নের দুর্জনিমহল গ্রামে নিজ বাড়ির সামনে রাস্তার পাশে বসে থাকা আক্তার ঢালী (৬৪) নামের এক বৃদ্ধকে গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। এর ৫১ দিন আগে গত ১৫ আগস্ট রাত সোয়া ৯টার দিকে একই এলাকার আবদুর রাজ্জাকের মোড়ে তার ছেলে জয় ঢালীকে (২৭) কুপিয়ে ও গলা কেটে হত্যা করা হয়।
স্থানীয় সূত্রের ভাষ্য, অপরাধী চক্রের অভ্যন্তরীণ বিরোধ ও এলাকায় প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে জয়কে হত্যা করা হয়েছিল। আক্তার ঢালীর হত্যাকাণ্ডের পেছনে ছেলের হত্যা মামলার আইনি প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করার উদ্দেশ্য ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।
গত ১১ আগস্ট রাতে উপজেলার নৈহাটি ইউনিয়নের রূপসা ব্রিকস নামের একটি ইটভাটায় ঢুকে যুবদল কর্মী ফখরুল শেখকে (৩২) গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। তিনি নৈহাটি গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন এবং ইটভাটাটিতে পাহারার দায়িত্বে ছিলেন। পূর্বশত্রুতা ও স্থানীয় বালুমহালের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধের জেরে এ হত্যাকাণ্ড ঘটে।
আঠারোবেকি নদী থেকে দুই যুবকের মরদেহ উদ্ধারের পর রূপসার রাজাপুর, নৈহাটি ও আইচগাতী এলাকার বাসিন্দা এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা নিরাপত্তাহীনতার কথা জানিয়েছেন। তাদের ভাষ্য, একের পর এক হত্যাকাণ্ডের কারণে সন্ধ্যার পর ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান খোলা রাখা কিংবা রাস্তায় বের হতেও ভয় পাচ্ছেন তারা। মাদক ও অপরাধী চক্র নির্মূল করে স্বাভাবিক জীবনযাপনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তারা।
রূপসার সচেতন বাসিন্দাদের মতে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চলমান অভিযান আরও জোরদার করা প্রয়োজন। তারা এলাকায় সন্ত্রাস ও অপরাধ দমনে কার্যকর পদক্ষেপ চান।
রূপসা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাসুম খান বলেন, আঠারোবেকি নদী থেকে উদ্ধার হওয়া দুই যুবকের শরীরে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। পুলিশ সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে ঘটনাটি তদন্ত করছে। অপরাধে জড়িত চক্রগুলোকে শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে পুলিশ ও গোয়েন্দা দল অভিযান চালাচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রীর সফরের দিন ডুমুরিয়ায় গুলি করে হত্যা
গত ৫ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের খুলনা সফরের দিন ডুমুরিয়ায় দুর্বৃত্তদের গুলিতে তরিকুল ইসলাম (৩৫) নামের এক ঘের ব্যবসায়ী নিহত হন। দুপুর পৌনে ২টার দিকে উপজেলার ১২ নম্বর রংপুর ইউনিয়নের আমভিটা-রামকৃষ্ণপুর জোড়া বটতলা এলাকায় গফফার সানার চায়ের দোকানে এ ঘটনা ঘটে। তরিকুল ওই ইউনিয়ন বিএনপির আহ্বায়ক শেখ আবদুস সালামের ছেলে।
পুলিশ, প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, শাওন নামের এক ব্যক্তিকে সঙ্গে নিয়ে লিজ নেওয়া ঘের থেকে বের হয়ে চায়ের দোকানে বসে চা পান করছিলেন তরিকুল। এ সময় হেলমেট ও মাস্ক পরা কয়েকজন দুর্বৃত্ত মোটরসাইকেলে এসে দোকানে ঢোকে। তারা খুব কাছ থেকে তরিকুলের মাথায় গুলি করে। গুলির শব্দে স্থানীয় লোকজন আতঙ্কে ছোটাছুটি শুরু করেন। এরপর মোটরসাইকেলে করে খুলনা-দৌলতপুর সড়কের দিকে পালিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা। গুলিতে ঘটনাস্থলেই তরিকুলের মৃত্যু হয়।
খবর পেয়ে ডুমুরিয়া থানা-পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে এবং এলাকা ঘিরে রাখে। ডুমুরিয়া থানার ওসি খন্দকার হাফিজুর রহমান বলেন, ‘হত্যাকাণ্ডের কারণ অনুসন্ধানে তদন্ত শুরু হয়েছে। জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত ও গ্রেফতারে অভিযান চলছে। এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।’
সমন্বিত টহল ও তল্লাশির পরিকল্পনা
খুলনা জেলার পুলিশ সুপার ওমর ফারুক বলেন, ‘সন্ত্রাস দমনে জেলা পুলিশ কঠোর অবস্থানে আছে। পরিস্থিতির উন্নয়নে বিশেষ অভিযান চালানো হচ্ছে। থানাগুলোর সীমান্তবর্তী এলাকায় টহল জোরদার এবং সমন্বিত চেকপোস্ট বসানোর পরিকল্পনা রয়েছে। মোটরসাইকেল তল্লাশির আওতাও বাড়ানো হবে।’
তিনি বলেন, ‘অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীরা দুর্গম ও সরু সড়ক দিয়ে মোটরসাইকেলে দ্রুত পালিয়ে যায়। এক থানার এলাকায় অপরাধ করে অন্য থানায় চলে যাওয়ার ঘটনাও ঘটে। এ কারণে বিভিন্ন থানার মধ্যে সমন্বয় করে অভিযান চালানোর পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে।’
কেএমপির কমিশনার মো. সাজ্জাদ হোসেন বলেন, ‘খুলনার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে পুলিশ শক্ত অবস্থান নিয়েছে। অধিকাংশ হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটন করা হয়েছে এবং বেশির ভাগ আসামিকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। মাদক ও অপরাধের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে গোয়েন্দা নজরদারি চলছে।’
তিনি বলেন, ‘অপরাধীরা অস্ত্র নিয়ে চলাচলে মোটরসাইকেল ব্যবহার করছে। গলিপথ দিয়ে দ্রুত পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকায় মোটরসাইকেলকে সন্দেহের তালিকায় রেখে তল্লাশি চালানো হচ্ছে।’

আপনার মতামত লিখুন