সারাদেশে প্রতিনিধি নিয়োগ দিচ্ছে ফোরকানুল হক (সাকিব) সম্পাদিত " TV 26 NEWS " আগ্রহীরা দ্রুত যোগাযোগ করুন। সব খবর সবার আগে পেতে আমাদের সাথেই থাকুন। ভূগর্ভস্থ ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ ও রোগজীবাণু মুক্ত করে সাঁথিয়া পৌরবাসীর দ্বারে দ্বারে সুপেয় পানি পৌঁছে দেওয়ার সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য ছিল। অপরিকল্পিত উদ্যোগ, নকশায় ত্রুটি এবং যথাযথ তদারকির অভাবে প্রায় ৮ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত পানি শোধনাগারটি এখন কোনো কাজে আসছে না। হস্তান্তরের মাত্র তিন মাসের মাথায় বন্ধ হয়ে যাওয়া এই শোধনাগারটি পাঁচ বছর ধরে বিকল পড়ে রয়েছে। এতে বিপুল পরিমাণ সরকারি অর্থের অপচয়ের পাশাপাশি প্রতি মাসে নিয়মিত বিল পরিশোধ করেও আয়রনযুক্ত ও ক্ষতিকর পানি পান করতে হচ্ছে পৌরবাসীকে।
হস্তান্তরের ৩ মাসেই বিকল
পৌরসভা কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০১৯-২০ অর্থবছরে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর প্রায় ৭ কোটি ৬১ লাখ টাকা ব্যয়ে এই পানি বিশুদ্ধকরণ কেন্দ্র নির্মাণের প্রকল্প গ্রহণ করে। গভীর নলকূপ স্থাপন, শোধনাগার নির্মাণ ও পাইপলাইনের মাধ্যমে সুপেয় পানি সংযোগ পৌঁছানোর কথা ছিল এ প্রকল্পের অধীনে। ২০২১ সালে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর প্রকল্পটি সাঁথিয়া পৌর কর্তৃপক্ষের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করে। হস্তান্তরের মাত্র তিন মাস পরেই কারিগরি ত্রুটি ও অসম ধারণক্ষমতার কারণে কেন্দ্রটি সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। দীর্ঘদিন ধরে অযত্নে পড়ে থাকায় শোধনাগারটির অনেক মূল্যবান যন্ত্রাংশ ও মোটর নষ্ট হতে বসেছে।
সূত্র আরও জানায়, ২৫ দশমিক ৫৩ বর্গকিলোমিটার আয়তনের সাঁথিয়া পৌরসভায় মোট ৯টি ওয়ার্ডে প্রায় ৬৫ হাজার মানুষের বাস। বর্তমানে মাত্র ৯টি গ্রামের ১ হাজার ১৬৫টি পরিবারের প্রায় ৬ হাজার মানুষ সরকারি পানি সংযোগের আওতায় রয়েছেন। প্রতিদিন তাদের পানির গড় চাহিদা ৮ লাখ ১৫ হাজার ৫০০ লিটার। নির্মিত শোধনাগারের রিজার্ভ বা ওভারহেড ট্যাঙ্কের ধারণক্ষমতা মাত্র ২ লাখ ৫০ হাজার লিটার। সাড়ে চার ঘণ্টা ধরে ৪ লাখ লিটার পানি তুলে তা সাড়ে ছয় ঘণ্টা ধরে নানা প্রক্রিয়ায় পরিশোধনের পর রিজার্ভ ট্যাঙ্কে তোলার পর লাইনে ছাড়া হলে মাত্র ৪০ থেকে ৪৫ মিনিটে সে পানি শেষ হয়ে যায়। এতে অল্প কিছু গ্রাহক সুপেয় পানি পেলেও অধিকাংশ পরিবার বঞ্চিত থাকেন। বাধ্য হয়ে কোনো শোধন ছাড়া সরাসরি পাম্পের আয়রনযুক্ত পানি লাইনে সরবরাহ করছে পৌর কর্তৃপক্ষ।
এছাড়া পানি বিশুদ্ধ করতে বিদ্যুৎ বিল এবং বিশুদ্ধকরণ উপকরণ বা মেডিসিন, অন্যান্য খরচসহ প্রতিমাসে প্রায় ৪ লাখ টাকা খরচ হয়। এই খরচ বহন করতে পৌরসভা কর্তৃপক্ষ হিমশিম খাচ্ছেন। ক্ষুব্ধ গ্রাহক, দায় এড়ানোর চেষ্টা সংশ্লিষ্টদের টাকা দিয়েও সুপেয় পানি না পেয়ে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
স্থানীয় বিদ্যালয়ের শিক্ষক শফিকুল ইসলাম রিপন আক্ষেপ করে জানান, প্রকল্প বাস্তবায়নের নামে কোটি কোটি টাকা জলে গেছে। পৌরবাসী বিল দেওয়ার পরও মৌলিক সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। স্থানীয় বাসিন্দা সজিব মাহমুদ ও গোলাম মোস্তফা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, পানিতে এত বেশি আয়রন যে কিছুক্ষণ পাত্রে রেখে দিলে লাল আস্তরণ পড়ে যায়। কাপড় ধোয়া বা পান করার উপযোগী নয় এই পানি। প্রশ্ন উঠেছে, অপরিবেশনযোগ্য ও আয়রনযুক্ত পানি সরবরাহ করে কেন পৌরবাসীর কাছ থেকে নিয়মিত পানির বিল আদায় করা হচ্ছে?
কারিগরি সমস্যা স্বীকার করে পৌরসভার ভারপ্রাপ্ত উপসহকারী প্রকৌশলী আবু ইসা শফিউল আলম বলেন, পর্যাপ্ত রিজার্ভ ট্যাঙ্ক না থাকায় এবং শোধন প্রক্রিয়া দীর্ঘ হওয়ায় সরাসরি পাম্পের পানি দিয়ে সাময়িক চাহিদা মেটাতে হচ্ছে। যদি আরও দু-তিনটি ওভারহেড ট্যাঙ্ক থাকত অথবা এক থেকে দেড় কিলোমিটারের মধ্যে থাকা ভালো পানির উৎস থেকে সংযোগ আনা যেত।
পৌর প্রশাসক ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) আসিফ রায়হান বলেন, ‘প্রকল্প গ্রহণের সময় পৌরসভার সঙ্গে কোনো আলোচনা করা হয়নি এবং পানির বর্তমান ও ভবিষ্যৎ চাহিদাও বিবেচনা করা হয়নি। প্রকল্পটি যখন গৃহীত হয়, তখনই পৌরসভার দৈনিক পানির চাহিদা ছিল প্রায় ৫ লাখ লিটার, যা বর্তমানে আরও বেড়েছে। অথচ মাত্র ২ লাখ ৫০ হাজার লিটার ধারণক্ষমতার ট্যাঙ্ক স্থাপন করা হয়েছে। চাহিদা ও জোগানের এই ব্যবধানের কারণে সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে।’ তিনি আরও জানান, কেন্দ্রটি চালুর বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। অন্যদিকে চাকা ঘোরাতে ব্যর্থ হলেও দায় নিতে রাজি নয় নির্মাণকারী সংস্থা। উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের সহকারী প্রকৌশলী ফজলে রাব্বী জানান, ৬-৭ বছর আগে শোধনাগার নির্মাণকাজ শেষ করে পৌরসভার কাছে হস্তান্তর করা হয়েছিল। হস্তান্তরের পর থেকে এর রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পৌর কর্তৃপক্ষের। তাদের দপ্তর থেকে কেবল কারিগরি সহায়তা ও পরামর্শ দেওয়া হয়। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরে বর্তমানে শুধু শোধনাগার ও ট্যাঙ্কের নকশা রয়েছে; পাইপলাইন বা কার্যাদেশের কোনো নথি নেই। প্রকল্প গ্রহণের সময় গ্রাহকের চাহিদা সঠিক যাচাই করা হয়েছিল কিনা–এমন প্রশ্নে তিনি জানান, সম্প্রতি যোগদান করায় এ বিষয়ে তার বিস্তারিত জানা নেই।
বিষয় : পানি

শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ভূগর্ভস্থ ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ ও রোগজীবাণু মুক্ত করে সাঁথিয়া পৌরবাসীর দ্বারে দ্বারে সুপেয় পানি পৌঁছে দেওয়ার সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য ছিল। অপরিকল্পিত উদ্যোগ, নকশায় ত্রুটি এবং যথাযথ তদারকির অভাবে প্রায় ৮ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত পানি শোধনাগারটি এখন কোনো কাজে আসছে না। হস্তান্তরের মাত্র তিন মাসের মাথায় বন্ধ হয়ে যাওয়া এই শোধনাগারটি পাঁচ বছর ধরে বিকল পড়ে রয়েছে। এতে বিপুল পরিমাণ সরকারি অর্থের অপচয়ের পাশাপাশি প্রতি মাসে নিয়মিত বিল পরিশোধ করেও আয়রনযুক্ত ও ক্ষতিকর পানি পান করতে হচ্ছে পৌরবাসীকে।
হস্তান্তরের ৩ মাসেই বিকল
পৌরসভা কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০১৯-২০ অর্থবছরে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর প্রায় ৭ কোটি ৬১ লাখ টাকা ব্যয়ে এই পানি বিশুদ্ধকরণ কেন্দ্র নির্মাণের প্রকল্প গ্রহণ করে। গভীর নলকূপ স্থাপন, শোধনাগার নির্মাণ ও পাইপলাইনের মাধ্যমে সুপেয় পানি সংযোগ পৌঁছানোর কথা ছিল এ প্রকল্পের অধীনে। ২০২১ সালে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর প্রকল্পটি সাঁথিয়া পৌর কর্তৃপক্ষের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করে। হস্তান্তরের মাত্র তিন মাস পরেই কারিগরি ত্রুটি ও অসম ধারণক্ষমতার কারণে কেন্দ্রটি সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। দীর্ঘদিন ধরে অযত্নে পড়ে থাকায় শোধনাগারটির অনেক মূল্যবান যন্ত্রাংশ ও মোটর নষ্ট হতে বসেছে।
সূত্র আরও জানায়, ২৫ দশমিক ৫৩ বর্গকিলোমিটার আয়তনের সাঁথিয়া পৌরসভায় মোট ৯টি ওয়ার্ডে প্রায় ৬৫ হাজার মানুষের বাস। বর্তমানে মাত্র ৯টি গ্রামের ১ হাজার ১৬৫টি পরিবারের প্রায় ৬ হাজার মানুষ সরকারি পানি সংযোগের আওতায় রয়েছেন। প্রতিদিন তাদের পানির গড় চাহিদা ৮ লাখ ১৫ হাজার ৫০০ লিটার। নির্মিত শোধনাগারের রিজার্ভ বা ওভারহেড ট্যাঙ্কের ধারণক্ষমতা মাত্র ২ লাখ ৫০ হাজার লিটার। সাড়ে চার ঘণ্টা ধরে ৪ লাখ লিটার পানি তুলে তা সাড়ে ছয় ঘণ্টা ধরে নানা প্রক্রিয়ায় পরিশোধনের পর রিজার্ভ ট্যাঙ্কে তোলার পর লাইনে ছাড়া হলে মাত্র ৪০ থেকে ৪৫ মিনিটে সে পানি শেষ হয়ে যায়। এতে অল্প কিছু গ্রাহক সুপেয় পানি পেলেও অধিকাংশ পরিবার বঞ্চিত থাকেন। বাধ্য হয়ে কোনো শোধন ছাড়া সরাসরি পাম্পের আয়রনযুক্ত পানি লাইনে সরবরাহ করছে পৌর কর্তৃপক্ষ।
এছাড়া পানি বিশুদ্ধ করতে বিদ্যুৎ বিল এবং বিশুদ্ধকরণ উপকরণ বা মেডিসিন, অন্যান্য খরচসহ প্রতিমাসে প্রায় ৪ লাখ টাকা খরচ হয়। এই খরচ বহন করতে পৌরসভা কর্তৃপক্ষ হিমশিম খাচ্ছেন। ক্ষুব্ধ গ্রাহক, দায় এড়ানোর চেষ্টা সংশ্লিষ্টদের টাকা দিয়েও সুপেয় পানি না পেয়ে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
স্থানীয় বিদ্যালয়ের শিক্ষক শফিকুল ইসলাম রিপন আক্ষেপ করে জানান, প্রকল্প বাস্তবায়নের নামে কোটি কোটি টাকা জলে গেছে। পৌরবাসী বিল দেওয়ার পরও মৌলিক সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। স্থানীয় বাসিন্দা সজিব মাহমুদ ও গোলাম মোস্তফা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, পানিতে এত বেশি আয়রন যে কিছুক্ষণ পাত্রে রেখে দিলে লাল আস্তরণ পড়ে যায়। কাপড় ধোয়া বা পান করার উপযোগী নয় এই পানি। প্রশ্ন উঠেছে, অপরিবেশনযোগ্য ও আয়রনযুক্ত পানি সরবরাহ করে কেন পৌরবাসীর কাছ থেকে নিয়মিত পানির বিল আদায় করা হচ্ছে?
কারিগরি সমস্যা স্বীকার করে পৌরসভার ভারপ্রাপ্ত উপসহকারী প্রকৌশলী আবু ইসা শফিউল আলম বলেন, পর্যাপ্ত রিজার্ভ ট্যাঙ্ক না থাকায় এবং শোধন প্রক্রিয়া দীর্ঘ হওয়ায় সরাসরি পাম্পের পানি দিয়ে সাময়িক চাহিদা মেটাতে হচ্ছে। যদি আরও দু-তিনটি ওভারহেড ট্যাঙ্ক থাকত অথবা এক থেকে দেড় কিলোমিটারের মধ্যে থাকা ভালো পানির উৎস থেকে সংযোগ আনা যেত।
পৌর প্রশাসক ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) আসিফ রায়হান বলেন, ‘প্রকল্প গ্রহণের সময় পৌরসভার সঙ্গে কোনো আলোচনা করা হয়নি এবং পানির বর্তমান ও ভবিষ্যৎ চাহিদাও বিবেচনা করা হয়নি। প্রকল্পটি যখন গৃহীত হয়, তখনই পৌরসভার দৈনিক পানির চাহিদা ছিল প্রায় ৫ লাখ লিটার, যা বর্তমানে আরও বেড়েছে। অথচ মাত্র ২ লাখ ৫০ হাজার লিটার ধারণক্ষমতার ট্যাঙ্ক স্থাপন করা হয়েছে। চাহিদা ও জোগানের এই ব্যবধানের কারণে সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে।’ তিনি আরও জানান, কেন্দ্রটি চালুর বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। অন্যদিকে চাকা ঘোরাতে ব্যর্থ হলেও দায় নিতে রাজি নয় নির্মাণকারী সংস্থা। উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের সহকারী প্রকৌশলী ফজলে রাব্বী জানান, ৬-৭ বছর আগে শোধনাগার নির্মাণকাজ শেষ করে পৌরসভার কাছে হস্তান্তর করা হয়েছিল। হস্তান্তরের পর থেকে এর রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পৌর কর্তৃপক্ষের। তাদের দপ্তর থেকে কেবল কারিগরি সহায়তা ও পরামর্শ দেওয়া হয়। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরে বর্তমানে শুধু শোধনাগার ও ট্যাঙ্কের নকশা রয়েছে; পাইপলাইন বা কার্যাদেশের কোনো নথি নেই। প্রকল্প গ্রহণের সময় গ্রাহকের চাহিদা সঠিক যাচাই করা হয়েছিল কিনা–এমন প্রশ্নে তিনি জানান, সম্প্রতি যোগদান করায় এ বিষয়ে তার বিস্তারিত জানা নেই।

আপনার মতামত লিখুন