ঢাকা    বুধবার, ০৭ অক্টোবর ২০২৬
ঢাকা    বুধবার, ০৭ অক্টোবর ২০২৬
টিভি ২৬ নিউজ

ব্যস্ত দিন কাটছে প্রতিমা শিল্পীদের

শারদীয় দুর্গাপূজা ঘনিয়ে আসায় ব্যস্ত সময় পার করছেন প্রতিমা শিল্পী ও কারিগররা। বাঁশ, কাঠ, খড় ও মাটির কাঠামোর কাজ শেষে এখন চলছে প্রতিমায় শেষ মুহূর্তের কারুকাজ, রঙ ও সাজসজ্জা। রাজধানীর শাঁখারীবাজার ও তাঁতীবাজারে দিন-রাত চলছে প্রতিমা তৈরির কাজ। সোমবার (৫ অক্টোবর) ও মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) রাজধানীর শাঁখারীবাজার, তাঁতীবাজার ও আশপাশের প্রতিমা তৈরির কারখানাগুলো ঘুরে দেখা গেছে, কোথাও মাটির প্রলেপ দেওয়া হচ্ছে, কোথাও আবার রঙ-তুলির আঁচড়ে ফুটিয়ে তোলা হচ্ছে দেব-দেবীর মুখাবয়ব। দুর্গা, লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক ও গণেশের চোখ, মুখ, পোশাক ও অলংকারের নকশা নিখুঁত করতে ব্যস্ত শিল্পীরা। কারিগররা জানান, প্রতিমা তৈরির প্রাথমিক কাজ শুরু হয় কয়েক মাস আগে। প্রথমে বাঁশ ও কাঠ দিয়ে মূল কাঠামো তৈরি করা হয়। এরপর খড় দিয়ে অবয়ব দাঁড় করিয়ে কয়েক ধাপে মাটির প্রলেপ দেওয়া হয়। মাটি শুকানোর পর চলে সূক্ষ্ম কারুকাজ। সবশেষে রঙ, অলংকার ও অন্যান্য সাজসজ্জা শেষ করে প্রতিমা মণ্ডপে পাঠানো হয়। শাঁখারীবাজারের প্রতিমা শিল্পী গোপাল চন্দ্র পাল বলেন, ‘প্রতি বছরের মতো এবারও প্রতিমার চাহিদা রয়েছে। তবে বাঁশ, কাঠ, খড়, মাটি ও রঙের মতো উপকরণের দাম বেড়েছে। পাশাপাশি কারিগরদের মজুরিও আগের তুলনায় বেশি। ফলে প্রতিমার দাম কিছুটা বাড়লেও উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় লাভ খুব বেশি থাকছে না।’ তিনি বলেন, ‘একটি প্রতিমা তৈরিতে বেশ সময় লাগে। প্রতিমার আকার ও নকশার ওপর সময় নির্ভর করে। এখন পূজার সময় ঘনিয়ে আসায় কাজের চাপ অনেক বেড়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রতিমা সরবরাহ করতে সবাই ব্যস্ত সময় পার করছি।’ শিল্পীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, একটি প্রতিমা তৈরিতে কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাস পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। ছোট ও সাধারণ নকশার প্রতিমা তুলনামূলক কম সময়ে তৈরি হলেও বড় আকারের কিংবা বিশেষ কারুকাজের প্রতিমায় শ্রম ও সময় দুটোই বেশি প্রয়োজন হয়। সে অনুযায়ী নির্ধারণ করা হয় প্রতিমার দাম। এ বছর রাজধানীসহ সারা দেশে প্রায় ৩৩ হাজার ৮৫১টি মণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হবে। এর মধ্যে ঢাকা মহানগরীতে পূজা হবে ২৫৯টি মণ্ডপে। গত বছর সারা দেশে ৩৩ হাজার ৩৫৫টি মণ্ডপে দুর্গাপূজা হয়েছিল। গত বছরের তুলনায় এবার ৪৯৬টি পূজামণ্ডপ বেড়েছে। বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি বাসুদেব ধর বলেন, ‘এ বছর রাজধানীসহ সারা দেশের প্রায় ৩৩ হাজার ৮৫১ মণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হবে। এর মধ্যে ঢাকা মহানগরে ২৫৯টি মণ্ডপে পূজা উদযাপিত হবে। দেশের কিছু জায়গায় প্রতিমা ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। এগুলো আমরা দেখছি। পূজায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সরকারের পক্ষ থেকে আমাদের সার্বিক সহযোগিতার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।’ দুর্গাপূজা ঘিরে পুরান ঢাকাতেও চলছে ব্যাপক প্রস্তুতি। ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির, আজিমপুর সরকারি কলোনি, ঋষিপাড়া দুর্গা মন্দির, শাঁখারীবাজার, তাঁতীবাজার ও লক্ষ্মীবাজার এলাকার অলিগলিতে পূজার আয়োজন করা হচ্ছে। ছোট-বড় বিভিন্ন মণ্ডপে চলছে মঞ্চ, প্যান্ডেল, তোরণ ও প্রতিমা নির্মাণের কাজ। স্বামীবাগে লোকনাথ মন্দির, রমনা কালীমন্দির ও মা আনন্দময়ী আশ্রম, সিদ্ধেশ্বরী কালীমন্দির, মিরপুর কেন্দ্রীয় মন্দির ও সিদ্ধেশ্বরী মণ্ডপেও পূজার আয়োজন চলছে। প্রতিমা তৈরির পাশাপাশি পূজামণ্ডপগুলোতেও চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। সাজসজ্জা, আলোকসজ্জা ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক কাজ এগিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি নিরাপত্তার প্রস্তুতিও চলছে। তাঁতীবাজার পূজা কমিটির সভাপতি চন্দন কুমার দে বলেন, ‘পূজার আর মাত্র সপ্তাহখানেক বাকি। প্রস্তুতির কাজ এখন পুরোদমে চলছে। চাঁদা সংগ্রহ, বিভিন্ন জায়গায় খোঁজ নেওয়া, প্রতিমা দেখাশোনা, প্যান্ডেল, লাইট, ডিজে এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক কাজ; সবকিছুই আমাদের দেখাশোনা করতে হচ্ছে।’ নিরাপত্তার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘নিরাপত্তার জন্য প্রশাসনের কাছে আমরা চিঠি দিয়েছি। পাশাপাশি বিভিন্ন মিটিংয়েও অংশ নিয়েছি। থানার মিটিং, ডিসি অফিসের মিটিংয়ে গিয়েছি। এছাড়া ঢাকেশ্বরী মন্দির ও এমপির কাছেও গিয়েছি। প্রয়োজন অনুযায়ী সামনে আরও যেখানে যেতে হবে, সেখানে যাবো। নিরাপত্তার বিষয়ে প্রশাসনের কাছ থেকে আমরা অনেক বড় সাড়া পেয়েছি। তারা বারবার বলছেন, কোনও সমস্যা নেই, বুক ফুলিয়ে পূজা করবেন। কোনও ব্যাপার নেই। আমরা সর্বক্ষণ আপনাদের পাশে আছি এবং টহলে থাকবে।’ চন্দন কুমার দে বলেন, গতবার ২১টি মণ্ডপে পূজা হয়েছিল, এবার ২২টি মণ্ডপে পূজা হবে। তাদের প্রত্যাশা, সবাই যথাযথভাবে এই মহা উৎসব পালন করবে। পূজামণ্ডপের নিরাপত্তায় পুলিশ সদর দফতর থেকে শুরু করে বিভাগ ও জেলা পর্যায়ে ২৪ ঘণ্টার মনিটরিং ব্যবস্থা থাকবে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) আসন্ন শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তা এবং সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিভিন্ন সংগঠনের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক শেষে তিনি এ কথা জানান। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘উপজেলা, জেলা, বিভাগ থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত কার কী দায়িত্ব থাকবে, সেটিও নির্ধারণ করা হয়েছে।’ পূজামণ্ডপের নিরাপত্তায় নির্বাচনের সময় ব্যবহৃত জাতীয় টেলিযোগাযোগ পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের (এনটিএমসি) একটি অ্যাপ ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কোনও অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটলে অ্যাপটির মাধ্যমে দ্রুত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো যাবে এবং তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে। জেলা পর্যায়ে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণও দেওয়া হবে। তিনি জানান, পুলিশ সদর দফতরে ২৪ ঘণ্টার মনিটরিং টিম থাকবে। জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়েও মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা থাকবে। প্রতিটি পূজামণ্ডপের স্বেচ্ছাসেবকদের নাম ও টেলিফোন নম্বরসহ প্রয়োজনীয় তথ্য সংশ্লিষ্ট থানায় দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এসব তথ্য যাচাইয়ের পর স্বেচ্ছাসেবকদের প্রয়োজনীয় পরিচয়পত্র দেওয়ার ব্যবস্থাও থাকবে। পূজামণ্ডপে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। বিদ্যুৎ চলে গেলে বিকল্প হিসেবে জেনারেটর এবং সেটিও কাজ না করলে চার্জার লাইটসহ বিকল্প আলোর ব্যবস্থা রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পূজা উদযাপন পরিষদ সূত্রে জানা গেছে, নিরাপত্তার পাশাপাশি প্রতিটি মণ্ডপের বিদ্যুৎ সংযোগ, অগ্নিনিরাপত্তা ও আশপাশের পরিবেশের বিষয়েও নজর দেওয়া হচ্ছে। উৎসব চলাকালে দর্শনার্থীদের চলাচল স্বাভাবিক রাখা এবং সার্বিক শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে সমন্বয় করা হবে। সরকারি ছুটির ক্যালেন্ডার অনুযায়ী, মহানবমী উপলক্ষে ২০ অক্টোবর এবং বিজয়া দশমী উপলক্ষে ২১ অক্টোবর ছুটি রয়েছে। এর সঙ্গে ২২ অক্টোবর বৃহস্পতিবারও নির্বাহী আদেশে সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। পরের দুই দিন ২৩ ও ২৪ অক্টোবর যথাক্রমে শুক্র ও শনিবার। ফলে ২০ অক্টোবর থেকে ২৪ অক্টোবর পর্যন্ত টানা পাঁচ দিন সরকারি ছুটি থাকবে। আগামী ১৬ অক্টোবর ষষ্ঠী পূজার মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হবে শারদীয় দুর্গোৎসব। পাঁচ দিনব্যাপী উদযাপনের পর ২২ অক্টোবর প্রতিমা বিসর্জনের (বিজয়া দশমী) মধ্য দিয়ে শেষ হবে দুর্গোৎসব। উৎসবকে ঘিরে শাঁখারীবাজার ও তাঁতীবাজারসহ রাজধানীর বিভিন্ন মণ্ডপ ও আশপাশের এলাকায় চলছে আলোকসজ্জা ও দৃষ্টিনন্দন সাজসজ্জার প্রস্তুতি।

ব্যস্ত দিন কাটছে প্রতিমা শিল্পীদের