ঢাকা    শুক্রবার, ০২ অক্টোবর ২০২৬
ঢাকা    শুক্রবার, ০২ অক্টোবর ২০২৬
টিভি ২৬ নিউজ
নোটিশ
  • টিভি ২৬ নিউজ  সারাদেশে প্রতিনিধি নিয়োগ দিচ্ছে ফোরকানুল হক (সাকিব) সম্পাদিত " TV 26 NEWS " আগ্রহীরা দ্রুত যোগাযোগ করুন। সব খবর সবার আগে পেতে আমাদের সাথেই থাকুন।
সর্বশেষ

রাজশাহী বক্ষব্যাধি হাসপাতাল

যন্ত্রপাতি ও জনবল সংকটে ব্যাহত চিকিৎসাসেবা


TV 26 NEWS ডেস্ক :
TV 26 NEWS ডেস্ক :
প্রকাশ ০১ অক্টোবর ২০২৬ | ১১:১১ এএম
| প্রিন্ট সংস্করণ | ফটো কার্ড

যন্ত্রপাতি ও জনবল সংকটে ব্যাহত চিকিৎসাসেবা

রাজশাহীর ১৫০ শয্যার বক্ষব্যাধি হাসপাতালে প্রতিদিন চিকিৎসা নিতে আসেন ২৫০-৩০০ রোগী। রংপুর ও খুলনা বিভাগের কিছু এলাকা থেকেও রোগীরা এখানে আসেন চিকিৎসা নিতে। বিপুলসংখ্যক রোগীর এই চাপ সামলাতে হাসপাতালটিতে অনুমোদিত চিকিৎসকের পদ রয়েছে মাত্র ১০টি।

এর মধ্যে একটি পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য। আবার কর্মরত কয়েকজন চিকিৎসককে পালন করতে হচ্ছে প্রশাসনিক দায়িত্বও। ফলে সীমিত জনবল দিয়ে বহির্বিভাগ, আন্তঃবিভাগ ও ২৪ ঘণ্টার জরুরি সেবা চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে।

শুধু চিকিৎসক সংকট নয়, পরীক্ষা-নিরীক্ষার যন্ত্রপাতি, টেকনোলজিস্ট ও ওষুধের ঘাটতিও রয়েছে হাসপাতালটিতে। কয়েক মাস ধরে ল্যাবরেটরির অ্যানালাইজার মেশিনে সমস্যা থাকায় ব্যাহত হচ্ছে বিভিন্ন পরীক্ষা। এক্স-রে বিভাগেও পুরোনো যন্ত্র নিয়ে রয়েছে জটিলতা। হাসপাতালে ইসিজি মেশিন রয়েছে মাত্র একটি। কোনো যন্ত্র নষ্ট হলে বিকল্প ব্যবস্থা না থাকায় রোগীদের অনেক ক্ষেত্রে বাইরে গিয়ে পরীক্ষা করাতে হচ্ছে।

১৯৬৬ সালে প্রতিষ্ঠিত এই হাসপাতালটি শুরুতে যক্ষ্মার চিকিৎসার জন্য চালু করা হয়। সময়ের সঙ্গে এর সেবার পরিধি বেড়ে বর্তমানে অ্যাজমা, ব্রঙ্কাইটিস, সিওপিডি ও শ্বাসতন্ত্রের বিভিন্ন রোগের চিকিৎসাও দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু সেবার পরিধি বাড়লেও প্রতিষ্ঠাকালীন অর্গানোগ্রাম অনুযায়ী চিকিৎসকের পদসংখ্যা বাড়েনি। জনবল রয়ে গেছে আগের কাঠামোতেই।

হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, অনুমোদিত ১০টি চিকিৎসক পদের মধ্যে সিনিয়র কনসালট্যান্টের একটি পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য। কর্মরত চিকিৎসকদের মধ্যে দুজন আবাসিক মেডিকেল অফিসার, একজন তত্ত্বাবধায়ক ও মেডিকেল সুপারিনটেনডেন্ট, একজন কনসালট্যান্ট এবং ছয়জন মেডিকেল অফিসার রয়েছেন। এসব চিকিৎসকেরই বহির্বিভাগের রোগী দেখা, আন্তঃবিভাগের রোগীদের চিকিৎসা এবং ২৪ ঘণ্টার জরুরি সেবা চালিয়ে নিতে হচ্ছে।

হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. মো. শারিকুল ইসলাম বলেন, চিকিৎসক সংকটের কারণে নিয়মিত সেবা দিতে চিকিৎসকদের ওপর চাপ তৈরি হচ্ছে। এখানে মোট চিকিৎসকের পদ ১০টি। এর মধ্যে দুজন আবাসিক মেডিকেল অফিসার, একজন তত্ত্বাবধায়ক ও মেডিকেল সুপারিনটেনডেন্ট, একজন কনসালট্যান্ট এবং ছয়জন মেডিকেল অফিসার রয়েছেন। মেডিকেল অফিসারদের বহির্বিভাগের রোগী দেখার পাশাপাশি ২৪ ঘণ্টার জরুরি সেবাও চালু রাখতে হয়।

তিনি বলেন, ২৪ ঘণ্টা জরুরি সেবা চালু থাকায় চিকিৎসকদের শিফটিং ডিউটি করতে হয়। প্রতি আট ঘণ্টা পরপর একজন চিকিৎসক দায়িত্বে আসেন এবং আরেকজন দায়িত্ব শেষ করে যান। ছয়জন চিকিৎসক দিয়ে শিফটিং ডিউটি বজায় রাখার পাশাপাশি বহির্বিভাগের সেবা চালু রাখা কঠিন। কোনো চিকিৎসক ছুটিতে থাকলে, ব্যক্তিগত কাজে বা প্রশিক্ষণে গেলে চাপ আরো বেড়ে যায়। চিকিৎসকের পদ বাড়ানো হলে রোগীরা আরো ভালো সেবা পাবেন এবং চিকিৎসকদের ওপর চাপও কমবে।

পরীক্ষা-নিরীক্ষায় যন্ত্রপাতির সংকট

চিকিৎসকের পাশাপাশি পরীক্ষা-নিরীক্ষার যন্ত্রপাতি নিয়েও সংকটে রয়েছে হাসপাতালটি। রোগ নির্ণয়ের জন্য প্রয়োজনীয় কিছু আধুনিক যন্ত্র নেই। কয়েকটি যন্ত্রে রয়েছে ত্রুটি। বিশেষ করে ল্যাবরেটরির অ্যানালাইজার মেশিনে সমস্যা থাকায় পাঁচ-ছয় মাস ধরে বিভিন্ন পরীক্ষা ব্যাহত হচ্ছে।

হাসপাতালের ল্যাব সাপোর্ট স্টাফ গোলাম মওলা বলেন, মেশিন নষ্ট থাকায় বেশকিছু পরীক্ষা হাসপাতালে করা সম্ভব হচ্ছে না। তিনি বলেন, এখানে রোগীদের অনেক ধরনের পরীক্ষা করানো হয়। মেশিন নষ্ট থাকায় বর্তমানে অনেক পরীক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে না। আরবিএস, ইলেকট্রোলাইটসহ কিছু বেসিক পরীক্ষা হচ্ছে। তবে পাঁচ-ছয় মাস ধরে মেশিনের সমস্যার কারণে অনেক পরীক্ষা ব্যাহত হচ্ছে। ফলে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করাতে অনেক রোগীকেই হাসপাতালের বাইরে যেতে হচ্ছে। এতে চিকিৎসার পাশাপাশি বাড়তি সময় ও অর্থ ব্যয় হচ্ছে তাদের।

হাসপাতালের সিনিয়র স্টাফ নার্স সাবিনা ইয়াসমিন বলেন, প্রতিদিন উল্লেখযোগ্যসংখ্যক রোগীর পরীক্ষা করতে হয়। প্রয়োজনের তুলনায় মেশিন কম থাকায় কোনো একটি যন্ত্রে সমস্যা দেখা দিলে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ব্যাহত হয়।

তিনি বলেন, প্রতিদিন ১৫-২০ জন রোগীর পরীক্ষা করতে হয়। ভর্তি থাকা রোগীদের পাশাপাশি আউটডোরের রোগীদেরও পরীক্ষা করতে হয়।

তিনি আরো বলেন, আমাদের একটি মেশিন আছে। কোনো কারণে মেশিন নষ্ট হলে বা ব্যাটারি পরিবর্তনের প্রয়োজন হলে সেবায় ব্যাঘাত ঘটে।

এক্স-রে মেশিন নিয়েও ভোগান্তি

হাসপাতালের এক্স-রে বিভাগেও দীর্ঘদিন ধরে যন্ত্রপাতি নিয়ে সমস্যা রয়েছে। মেডিকেল টেকনোলজিস্ট (রেডিওগ্রাফি) সাজ্জাদ আলী বলেন, দীর্ঘদিন কাজ করার পর আমাদের মেশিনটি দুবার হঠাৎ নষ্ট হয়। পরে কর্তৃপক্ষ মেরামত করেছে। কিন্তু মেশিনটিতে আবারও সমস্যা দেখা দিয়েছে। মেরামতের জন্য কর্তৃপক্ষ ঢাকায় যোগাযোগ করছে বলেও জানান তিনি।

হাসপাতালের সুপারিনটেনডেন্ট ডা. মোহা. মজিবুর রহমানের দাবি, বর্তমানে এক্স-রে মেশিনটি সচল রয়েছে। ল্যাবরেটরির অ্যানালাইজার মেশিনে সমস্যা দেখা দিয়েছে এবং সেটি মেরামতের জন্য চাহিদাপত্র পাঠানো হয়েছে।

হাসপাতালে ইসিজি মেশিনও রয়েছে মাত্র একটি। ফলে মেশিনটিতে কারিগরি ত্রুটি দেখা দিলে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

ওষুধের তালিকা ৪৮, সরবরাহ ২০-২৫ ধরনের

চিকিৎসক ও যন্ত্রপাতির পাশাপাশি ওষুধ সরবরাহেও রয়েছে সীমাবদ্ধতা। সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, হাসপাতালে প্রায় ৪৮ ধরনের ওষুধ সরবরাহের তালিকা থাকলেও রোগীদের নিয়মিতভাবে দেওয়া হচ্ছে ২০-২৫ ধরনের ওষুধ। প্রয়োজনীয় অন্যান্য ওষুধ অনেক রোগীকেই বাইরে থেকে কিনতে হচ্ছে।

হাসপাতালের ফার্মাসিস্ট শীলা রানী দত্ত বলেন, রোগীদের প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন ধরনের ওষুধ সরবরাহ করা হয়। এখানে অ্যান্টিবায়োটিক, অ্যান্টিহিস্টামিন, অ্যানালজেসিকসহ বিভিন্ন ধরনের ওষুধ দেওয়া হয়। ২০-২৫ ধরনের ওষুধ দেওয়া হয়। প্রতিদিন ২৫০-৩০০ রোগীকে ওষুধ সরবরাহ করা হয়।

টেকনোলজিস্টও কম

হাসপাতালের কারিগরি জনবলও প্রয়োজনের তুলনায় কম। কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ল্যাবরেটরিতে একজন এবং এক্স-রে বিভাগে একজন টেকনোলজিস্ট রয়েছেন। সুপারিনটেনডেন্ট ডা. মজিবুর বলেন, ল্যাবরেটরিতে একজন টেকনোলজিস্ট, এক্স-রেতে একজন টেকনোলজিস্ট এবং তিনজন ফার্মাসিস্ট রয়েছেন। সব মিলিয়ে টেকনোলজিস্টের পদ আরো বাড়িয়ে পাঁচটি করা হলে ভালো হতো।

ভবনেও জীর্ণতার ছাপ

২৭ একর জায়গার ওপর প্রতিষ্ঠিত হাসপাতালটির অবকাঠামোতেও রয়েছে নানা সমস্যা। ৬০ বছরের পুরোনো ভবনের বিভিন্ন দেয়াল ও ছাদে পলেস্তারা খসে পড়ছে। কয়েক দফা সংস্কার করা হলেও বিভিন্ন স্থানে আবারও একই সমস্যা দেখা দিয়েছে। কোথাও কোথাও দরজা-জানালাও ভাঙাচোরা অবস্থা দেখা যায়।

সুপারিনটেনডেন্ট ডা. মজিবুর বলেন, হাসপাতাল ভবনটি ১৯৬৬ সালের। পুরোনো হওয়ায় কিছু জায়গায়, বিশেষ করে কয়েকটি ওয়ার্ডে পলেস্তারা খসে পড়ার সমস্যা রয়েছে। গণপূর্ত বিভাগের সঙ্গে যোগাযোগ করে সেগুলো সংস্কার করেছি। বর্তমানে আরো দুয়েকটি জায়গায় সমস্যা দেখা দিয়েছে। বিষয়টি গণপূর্ত বিভাগকে জানানো হয়েছে। তারা দু-চার দিনের মধ্যে সেগুলো সংস্কার করে দেওয়ার কথা জানিয়েছে। হাসপাতালের জন্য নতুন একটি মেডিকেল ভবন নির্মাণ করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।

বাইরে কিনতে হচ্ছে ওষুধ

হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের বক্তব্যেও উঠে এসেছে বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার কথা। নগরীর বাসিন্দা ফাতেমা খানম বলেন, বক্ষব্যাধি হাসপাতাল দেখতে অনেক বড়। কিন্তু ডাক্তারের সংখ্যা নাকি খুব কম। এছাড়া এখানে সব ধরনের পরীক্ষা করা যায় না এবং বাইরে থেকে ওষুধ কিনতে হয়।

কাশিয়াডাঙ্গার কুদ্দুস আলী কয়েকদিন ধরে হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন। হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা সম্পর্কে তিনি বলেন, চিকিৎসাসেবা মোটামুটি ভালো, খারাপ না।

চাপ সামলেও তিন ধরনের সেবা

সীমাবদ্ধতার মধ্যেও আউটডোর, ইনডোর ও ২৪ ঘণ্টার জরুরি সেবা চালু রাখার কথা জানিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। সুপারিনটেনডেন্ট ডা. মজিবুর বলেন, এখানে তিন ধরনের সেবা চালু আছে—আউটডোর, ইনডোর ও ইমার্জেন্সি। মূলত রাজশাহী বিভাগের বিভিন্ন এলাকা থেকে রোগীরা চিকিৎসা নিতে আসেন। রংপুর ও খুলনা বিভাগের কিছু এলাকা থেকেও রোগী আসে।

তিনি বলেন, ইনডোর, আউটডোর ও ইমার্জেন্সি সেবা ১০ জন চিকিৎসক দিয়েই চালানো হচ্ছে। তবে বিপুলসংখ্যক রোগীর চাপের বিপরীতে চিকিৎসক, টেকনোলজিস্ট, যন্ত্রপাতি ও ওষুধের এই সীমাবদ্ধতা দীর্ঘমেয়াদে হাসপাতালটির চিকিৎসাসেবার সক্ষমতা কতটা ধরে রাখতে পারবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

আপনার মতামত লিখুন

টিভি ২৬ নিউজ

শুক্রবার, ০২ অক্টোবর ২০২৬


যন্ত্রপাতি ও জনবল সংকটে ব্যাহত চিকিৎসাসেবা

প্রকাশের তারিখ : ০১ অক্টোবর ২০২৬

featured Image

রাজশাহীর ১৫০ শয্যার বক্ষব্যাধি হাসপাতালে প্রতিদিন চিকিৎসা নিতে আসেন ২৫০-৩০০ রোগী। রংপুর ও খুলনা বিভাগের কিছু এলাকা থেকেও রোগীরা এখানে আসেন চিকিৎসা নিতে। বিপুলসংখ্যক রোগীর এই চাপ সামলাতে হাসপাতালটিতে অনুমোদিত চিকিৎসকের পদ রয়েছে মাত্র ১০টি।

এর মধ্যে একটি পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য। আবার কর্মরত কয়েকজন চিকিৎসককে পালন করতে হচ্ছে প্রশাসনিক দায়িত্বও। ফলে সীমিত জনবল দিয়ে বহির্বিভাগ, আন্তঃবিভাগ ও ২৪ ঘণ্টার জরুরি সেবা চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে।

শুধু চিকিৎসক সংকট নয়, পরীক্ষা-নিরীক্ষার যন্ত্রপাতি, টেকনোলজিস্ট ও ওষুধের ঘাটতিও রয়েছে হাসপাতালটিতে। কয়েক মাস ধরে ল্যাবরেটরির অ্যানালাইজার মেশিনে সমস্যা থাকায় ব্যাহত হচ্ছে বিভিন্ন পরীক্ষা। এক্স-রে বিভাগেও পুরোনো যন্ত্র নিয়ে রয়েছে জটিলতা। হাসপাতালে ইসিজি মেশিন রয়েছে মাত্র একটি। কোনো যন্ত্র নষ্ট হলে বিকল্প ব্যবস্থা না থাকায় রোগীদের অনেক ক্ষেত্রে বাইরে গিয়ে পরীক্ষা করাতে হচ্ছে।

১৯৬৬ সালে প্রতিষ্ঠিত এই হাসপাতালটি শুরুতে যক্ষ্মার চিকিৎসার জন্য চালু করা হয়। সময়ের সঙ্গে এর সেবার পরিধি বেড়ে বর্তমানে অ্যাজমা, ব্রঙ্কাইটিস, সিওপিডি ও শ্বাসতন্ত্রের বিভিন্ন রোগের চিকিৎসাও দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু সেবার পরিধি বাড়লেও প্রতিষ্ঠাকালীন অর্গানোগ্রাম অনুযায়ী চিকিৎসকের পদসংখ্যা বাড়েনি। জনবল রয়ে গেছে আগের কাঠামোতেই।

হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, অনুমোদিত ১০টি চিকিৎসক পদের মধ্যে সিনিয়র কনসালট্যান্টের একটি পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য। কর্মরত চিকিৎসকদের মধ্যে দুজন আবাসিক মেডিকেল অফিসার, একজন তত্ত্বাবধায়ক ও মেডিকেল সুপারিনটেনডেন্ট, একজন কনসালট্যান্ট এবং ছয়জন মেডিকেল অফিসার রয়েছেন। এসব চিকিৎসকেরই বহির্বিভাগের রোগী দেখা, আন্তঃবিভাগের রোগীদের চিকিৎসা এবং ২৪ ঘণ্টার জরুরি সেবা চালিয়ে নিতে হচ্ছে।

হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. মো. শারিকুল ইসলাম বলেন, চিকিৎসক সংকটের কারণে নিয়মিত সেবা দিতে চিকিৎসকদের ওপর চাপ তৈরি হচ্ছে। এখানে মোট চিকিৎসকের পদ ১০টি। এর মধ্যে দুজন আবাসিক মেডিকেল অফিসার, একজন তত্ত্বাবধায়ক ও মেডিকেল সুপারিনটেনডেন্ট, একজন কনসালট্যান্ট এবং ছয়জন মেডিকেল অফিসার রয়েছেন। মেডিকেল অফিসারদের বহির্বিভাগের রোগী দেখার পাশাপাশি ২৪ ঘণ্টার জরুরি সেবাও চালু রাখতে হয়।

তিনি বলেন, ২৪ ঘণ্টা জরুরি সেবা চালু থাকায় চিকিৎসকদের শিফটিং ডিউটি করতে হয়। প্রতি আট ঘণ্টা পরপর একজন চিকিৎসক দায়িত্বে আসেন এবং আরেকজন দায়িত্ব শেষ করে যান। ছয়জন চিকিৎসক দিয়ে শিফটিং ডিউটি বজায় রাখার পাশাপাশি বহির্বিভাগের সেবা চালু রাখা কঠিন। কোনো চিকিৎসক ছুটিতে থাকলে, ব্যক্তিগত কাজে বা প্রশিক্ষণে গেলে চাপ আরো বেড়ে যায়। চিকিৎসকের পদ বাড়ানো হলে রোগীরা আরো ভালো সেবা পাবেন এবং চিকিৎসকদের ওপর চাপও কমবে।

পরীক্ষা-নিরীক্ষায় যন্ত্রপাতির সংকট

চিকিৎসকের পাশাপাশি পরীক্ষা-নিরীক্ষার যন্ত্রপাতি নিয়েও সংকটে রয়েছে হাসপাতালটি। রোগ নির্ণয়ের জন্য প্রয়োজনীয় কিছু আধুনিক যন্ত্র নেই। কয়েকটি যন্ত্রে রয়েছে ত্রুটি। বিশেষ করে ল্যাবরেটরির অ্যানালাইজার মেশিনে সমস্যা থাকায় পাঁচ-ছয় মাস ধরে বিভিন্ন পরীক্ষা ব্যাহত হচ্ছে।

হাসপাতালের ল্যাব সাপোর্ট স্টাফ গোলাম মওলা বলেন, মেশিন নষ্ট থাকায় বেশকিছু পরীক্ষা হাসপাতালে করা সম্ভব হচ্ছে না। তিনি বলেন, এখানে রোগীদের অনেক ধরনের পরীক্ষা করানো হয়। মেশিন নষ্ট থাকায় বর্তমানে অনেক পরীক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে না। আরবিএস, ইলেকট্রোলাইটসহ কিছু বেসিক পরীক্ষা হচ্ছে। তবে পাঁচ-ছয় মাস ধরে মেশিনের সমস্যার কারণে অনেক পরীক্ষা ব্যাহত হচ্ছে। ফলে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করাতে অনেক রোগীকেই হাসপাতালের বাইরে যেতে হচ্ছে। এতে চিকিৎসার পাশাপাশি বাড়তি সময় ও অর্থ ব্যয় হচ্ছে তাদের।

হাসপাতালের সিনিয়র স্টাফ নার্স সাবিনা ইয়াসমিন বলেন, প্রতিদিন উল্লেখযোগ্যসংখ্যক রোগীর পরীক্ষা করতে হয়। প্রয়োজনের তুলনায় মেশিন কম থাকায় কোনো একটি যন্ত্রে সমস্যা দেখা দিলে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ব্যাহত হয়।

তিনি বলেন, প্রতিদিন ১৫-২০ জন রোগীর পরীক্ষা করতে হয়। ভর্তি থাকা রোগীদের পাশাপাশি আউটডোরের রোগীদেরও পরীক্ষা করতে হয়।

তিনি আরো বলেন, আমাদের একটি মেশিন আছে। কোনো কারণে মেশিন নষ্ট হলে বা ব্যাটারি পরিবর্তনের প্রয়োজন হলে সেবায় ব্যাঘাত ঘটে।

এক্স-রে মেশিন নিয়েও ভোগান্তি

হাসপাতালের এক্স-রে বিভাগেও দীর্ঘদিন ধরে যন্ত্রপাতি নিয়ে সমস্যা রয়েছে। মেডিকেল টেকনোলজিস্ট (রেডিওগ্রাফি) সাজ্জাদ আলী বলেন, দীর্ঘদিন কাজ করার পর আমাদের মেশিনটি দুবার হঠাৎ নষ্ট হয়। পরে কর্তৃপক্ষ মেরামত করেছে। কিন্তু মেশিনটিতে আবারও সমস্যা দেখা দিয়েছে। মেরামতের জন্য কর্তৃপক্ষ ঢাকায় যোগাযোগ করছে বলেও জানান তিনি।

হাসপাতালের সুপারিনটেনডেন্ট ডা. মোহা. মজিবুর রহমানের দাবি, বর্তমানে এক্স-রে মেশিনটি সচল রয়েছে। ল্যাবরেটরির অ্যানালাইজার মেশিনে সমস্যা দেখা দিয়েছে এবং সেটি মেরামতের জন্য চাহিদাপত্র পাঠানো হয়েছে।

হাসপাতালে ইসিজি মেশিনও রয়েছে মাত্র একটি। ফলে মেশিনটিতে কারিগরি ত্রুটি দেখা দিলে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

ওষুধের তালিকা ৪৮, সরবরাহ ২০-২৫ ধরনের

চিকিৎসক ও যন্ত্রপাতির পাশাপাশি ওষুধ সরবরাহেও রয়েছে সীমাবদ্ধতা। সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, হাসপাতালে প্রায় ৪৮ ধরনের ওষুধ সরবরাহের তালিকা থাকলেও রোগীদের নিয়মিতভাবে দেওয়া হচ্ছে ২০-২৫ ধরনের ওষুধ। প্রয়োজনীয় অন্যান্য ওষুধ অনেক রোগীকেই বাইরে থেকে কিনতে হচ্ছে।

হাসপাতালের ফার্মাসিস্ট শীলা রানী দত্ত বলেন, রোগীদের প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন ধরনের ওষুধ সরবরাহ করা হয়। এখানে অ্যান্টিবায়োটিক, অ্যান্টিহিস্টামিন, অ্যানালজেসিকসহ বিভিন্ন ধরনের ওষুধ দেওয়া হয়। ২০-২৫ ধরনের ওষুধ দেওয়া হয়। প্রতিদিন ২৫০-৩০০ রোগীকে ওষুধ সরবরাহ করা হয়।

টেকনোলজিস্টও কম

হাসপাতালের কারিগরি জনবলও প্রয়োজনের তুলনায় কম। কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ল্যাবরেটরিতে একজন এবং এক্স-রে বিভাগে একজন টেকনোলজিস্ট রয়েছেন। সুপারিনটেনডেন্ট ডা. মজিবুর বলেন, ল্যাবরেটরিতে একজন টেকনোলজিস্ট, এক্স-রেতে একজন টেকনোলজিস্ট এবং তিনজন ফার্মাসিস্ট রয়েছেন। সব মিলিয়ে টেকনোলজিস্টের পদ আরো বাড়িয়ে পাঁচটি করা হলে ভালো হতো।

ভবনেও জীর্ণতার ছাপ

২৭ একর জায়গার ওপর প্রতিষ্ঠিত হাসপাতালটির অবকাঠামোতেও রয়েছে নানা সমস্যা। ৬০ বছরের পুরোনো ভবনের বিভিন্ন দেয়াল ও ছাদে পলেস্তারা খসে পড়ছে। কয়েক দফা সংস্কার করা হলেও বিভিন্ন স্থানে আবারও একই সমস্যা দেখা দিয়েছে। কোথাও কোথাও দরজা-জানালাও ভাঙাচোরা অবস্থা দেখা যায়।

সুপারিনটেনডেন্ট ডা. মজিবুর বলেন, হাসপাতাল ভবনটি ১৯৬৬ সালের। পুরোনো হওয়ায় কিছু জায়গায়, বিশেষ করে কয়েকটি ওয়ার্ডে পলেস্তারা খসে পড়ার সমস্যা রয়েছে। গণপূর্ত বিভাগের সঙ্গে যোগাযোগ করে সেগুলো সংস্কার করেছি। বর্তমানে আরো দুয়েকটি জায়গায় সমস্যা দেখা দিয়েছে। বিষয়টি গণপূর্ত বিভাগকে জানানো হয়েছে। তারা দু-চার দিনের মধ্যে সেগুলো সংস্কার করে দেওয়ার কথা জানিয়েছে। হাসপাতালের জন্য নতুন একটি মেডিকেল ভবন নির্মাণ করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।

বাইরে কিনতে হচ্ছে ওষুধ

হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের বক্তব্যেও উঠে এসেছে বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার কথা। নগরীর বাসিন্দা ফাতেমা খানম বলেন, বক্ষব্যাধি হাসপাতাল দেখতে অনেক বড়। কিন্তু ডাক্তারের সংখ্যা নাকি খুব কম। এছাড়া এখানে সব ধরনের পরীক্ষা করা যায় না এবং বাইরে থেকে ওষুধ কিনতে হয়।

কাশিয়াডাঙ্গার কুদ্দুস আলী কয়েকদিন ধরে হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন। হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা সম্পর্কে তিনি বলেন, চিকিৎসাসেবা মোটামুটি ভালো, খারাপ না।

চাপ সামলেও তিন ধরনের সেবা

সীমাবদ্ধতার মধ্যেও আউটডোর, ইনডোর ও ২৪ ঘণ্টার জরুরি সেবা চালু রাখার কথা জানিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। সুপারিনটেনডেন্ট ডা. মজিবুর বলেন, এখানে তিন ধরনের সেবা চালু আছে—আউটডোর, ইনডোর ও ইমার্জেন্সি। মূলত রাজশাহী বিভাগের বিভিন্ন এলাকা থেকে রোগীরা চিকিৎসা নিতে আসেন। রংপুর ও খুলনা বিভাগের কিছু এলাকা থেকেও রোগী আসে।

তিনি বলেন, ইনডোর, আউটডোর ও ইমার্জেন্সি সেবা ১০ জন চিকিৎসক দিয়েই চালানো হচ্ছে। তবে বিপুলসংখ্যক রোগীর চাপের বিপরীতে চিকিৎসক, টেকনোলজিস্ট, যন্ত্রপাতি ও ওষুধের এই সীমাবদ্ধতা দীর্ঘমেয়াদে হাসপাতালটির চিকিৎসাসেবার সক্ষমতা কতটা ধরে রাখতে পারবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।


টিভি ২৬ নিউজ

সম্পাদক ও প্রকাশকঃ~ ফোরকানুল হক (সাকিব)

কপিরাইট © ২০২৬ টিভি ২৬ নিউজ । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত