সারাদেশে প্রতিনিধি নিয়োগ দিচ্ছে ফোরকানুল হক (সাকিব) সম্পাদিত " TV 26 NEWS " আগ্রহীরা দ্রুত যোগাযোগ করুন। সব খবর সবার আগে পেতে আমাদের সাথেই থাকুন। একটি রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক চরিত্র কতটা শক্তিশালী, তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সূচক হলো সেই দেশের গণমাধ্যম কতটা স্বাধীনভাবে সত্য ও জনস্বার্থের কথা বলতে পারে। কারণ গণমাধ্যম শুধু খবর প্রকাশ করে না—এটি রাষ্ট্রের কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণ করে, জনগণের প্রশ্ন সামনে আনে এবং ক্ষমতাসীনদের জবাবদিহির আওতায় রাখে।
বাংলাদেশেও গণমাধ্যমের সেই দায়িত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্বাধীনতার পর থেকে সংবাদপত্র, টেলিভিশন, রেডিও এবং বর্তমানে অনলাইন নিউজ পোর্টাল—সব মাধ্যমই সমাজের নানা ঘটনা ও সংকট জনগণের সামনে তুলে ধরেছে। দুর্নীতি, অনিয়ম, মানবাধিকার, জনদুর্ভোগ, রাজনৈতিক সংঘাত, প্রশাসনিক ব্যর্থতা কিংবা সামাজিক বৈষম্য—অনেক ক্ষেত্রেই গণমাধ্যমের প্রতিবেদন জনআলোচনার সূচনা করেছে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো—আজকের বাংলাদেশে গণমাধ্যম কি যথেষ্ট স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছে? আর স্বাধীনতার পাশাপাশি সংবাদমাধ্যম কি তার নিজস্ব পেশাগত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করছে?
স্বাধীনতা শুধু অধিকার নয়, দায়িত্বও
গণমাধ্যমের স্বাধীনতা গণতন্ত্রের অন্যতম ভিত্তি। একজন সাংবাদিক যেন ভয়, চাপ বা প্রতিশোধের আশঙ্কা ছাড়াই সত্য তথ্য অনুসন্ধান ও প্রকাশ করতে পারেন—এমন পরিবেশ নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
তবে স্বাধীনতা মানে যা খুশি তা প্রকাশ করা নয়। সংবাদ প্রকাশের সঙ্গে যুক্ত থাকে সত্যতা যাচাই, নৈতিকতা, ব্যক্তির মর্যাদা, জনস্বার্থ এবং আইনের প্রতি সম্মান।
কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রকাশের আগে তথ্য-প্রমাণ যাচাই করা, অভিযুক্ত পক্ষের বক্তব্য নেওয়া এবং অভিযোগকে প্রমাণিত সত্য হিসেবে উপস্থাপন না করা সাংবাদিকতার মৌলিক দায়িত্ব।
স্বাধীন সাংবাদিকতা যেমন প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা।
ক্ষমতার সামনে প্রশ্ন করাই সাংবাদিকতার অন্যতম দায়িত্ব
গণমাধ্যমের কাজ সরকারের প্রশংসা করা নয়, আবার বিরোধিতা করাও নয়। গণমাধ্যমের মূল দায়িত্ব হলো—যেখানে প্রশ্ন আছে, সেখানে প্রশ্ন করা; যেখানে অনিয়মের অভিযোগ আছে, সেখানে তথ্য অনুসন্ধান করা; আর যেখানে জনগণের স্বার্থ জড়িত, সেখানে জনগণের কণ্ঠ তুলে ধরা।
ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল, বিরোধী দল, প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, ব্যবসায়ী গোষ্ঠী কিংবা অন্য কোনো প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠান—কেউই সাংবাদিকতার প্রশ্নের ঊর্ধ্বে থাকা উচিত নয়।
একই মানদণ্ড সবার জন্য প্রয়োগ করতে না পারলে সংবাদমাধ্যমের নিরপেক্ষতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
সাংবাদিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি
একজন সাংবাদিক যখন মাঠে গিয়ে সংবাদ সংগ্রহ করেন, তখন তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শুধু সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যমের দায়িত্ব নয়; এটি রাষ্ট্র ও সমাজেরও দায়িত্ব।
সাংবাদিকের ওপর হামলা, ভয়ভীতি, হুমকি, হয়রানি কিংবা সংবাদ প্রকাশের কারণে প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের অভিযোগগুলো গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।
কারণ একজন সাংবাদিককে ভয় দেখানো মানে শুধু একজন ব্যক্তিকে চুপ করিয়ে দেওয়া নয়—এর ফলে একটি ঘটনা সম্পর্কে জনগণের জানার অধিকারও বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
ডিজিটাল যুগে গুজব ও অপতথ্যের চ্যালেঞ্জ
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনলাইন নিউজ পোর্টালের বিস্তারের ফলে সংবাদ এখন মানুষের হাতে পৌঁছায় কয়েক সেকেন্ডে। এটি যেমন গণমাধ্যমকে শক্তিশালী করেছে, তেমনি তৈরি করেছে নতুন ঝুঁকি।
যাচাইহীন তথ্য, ভুয়া খবর, পুরোনো ছবি দিয়ে নতুন ঘটনার বিভ্রান্তিকর উপস্থাপন, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত শিরোনাম এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের গুজব—এসব মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে পারে।
তাই ‘সবার আগে সংবাদ’ দেওয়ার প্রতিযোগিতার চেয়ে ‘সঠিক সংবাদ’ দেওয়ার প্রতিযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ।
একটি সংবাদ কয়েক মিনিট দেরিতে প্রকাশিত হলে তার ক্ষতি সীমিত হতে পারে; কিন্তু ভুল সংবাদ হাজার মানুষের কাছে পৌঁছে গেলে তার সামাজিক ক্ষতি অনেক বড় হতে পারে।
সংবাদমাধ্যমের নিজেদেরও আত্মসমালোচনা প্রয়োজন
গণমাধ্যমের স্বাধীনতার কথা বলার পাশাপাশি গণমাধ্যমের নিজের ভুল ও সীমাবদ্ধতা নিয়েও আলোচনা হওয়া দরকার।
ক্লিক ও ভিউ বাড়ানোর জন্য অতিরঞ্জিত শিরোনাম, যাচাইহীন তথ্য, একপাক্ষিক বক্তব্য, রাজনৈতিক পক্ষপাত কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টকে সরাসরি সংবাদ হিসেবে প্রকাশ—এসব সাংবাদিকতার মানকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
একটি প্রতিষ্ঠানের রাজনৈতিক বা বাণিজ্যিক স্বার্থ যদি সংবাদ নির্বাচনে প্রভাব ফেলে, তাহলে পাঠকের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
তাই গণমাধ্যমকে নিয়মিতভাবে নিজেদের প্রশ্ন করতে হবে—
আমরা কি সত্য প্রকাশ করছি?
আমরা কি সব পক্ষের বক্তব্য নিচ্ছি?
আমরা কি জনস্বার্থকে অগ্রাধিকার দিচ্ছি?
আমরা কি ভুল হলে তা স্বীকার করছি?
এই আত্মজিজ্ঞাসাই দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার ভিত্তি।
মতের পার্থক্য থাকবে, সত্যের মানদণ্ড এক হওয়া উচিত
বাংলাদেশ একটি বহুমতের সমাজ। রাজনৈতিক মতাদর্শ, সামাজিক অবস্থান ও দৃষ্টিভঙ্গিতে মানুষের মধ্যে পার্থক্য থাকবেই। গণমাধ্যমের কাজ সেই মতপার্থক্যকে আরও সংঘাতপূর্ণ করা নয়; বরং তথ্য ও যুক্তির ভিত্তিতে জনগণের সামনে বিভিন্ন মত তুলে ধরা।
বিশেষ করে রাজনৈতিক সংঘাত, সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা, পার্বত্য অঞ্চল, মানবাধিকার কিংবা জাতীয় নিরাপত্তার মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে সাংবাদিকদের আরও সতর্ক হতে হবে।
কারও বক্তব্য প্রকাশ করা এবং সেই বক্তব্যকে সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা—দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। সংবাদে এই পার্থক্য স্পষ্ট থাকা জরুরি।
প্রয়োজন স্বাধীন, পেশাদার ও জবাবদিহিমূলক গণমাধ্যম
বাংলাদেশের গণমাধ্যমকে শক্তিশালী করতে হলে একই সঙ্গে কয়েকটি বিষয় নিশ্চিত করা প্রয়োজন—সাংবাদিকদের নিরাপত্তা, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা, তথ্যপ্রাপ্তির সুযোগ, পেশাগত প্রশিক্ষণ, সম্পাদকীয় স্বাধীনতা এবং সাংবাদিকতার নৈতিক মানদণ্ড।
একই সঙ্গে গণমাধ্যমের ওপর অযাচিত রাজনৈতিক বা বাণিজ্যিক চাপ কমাতে হবে। সাংবাদিকের কলম যেন ভয় বা স্বার্থের কাছে বন্দি না হয়—এটাই হওয়া উচিত গণতান্ত্রিক সমাজের প্রত্যাশা।
তবে গণমাধ্যমের স্বাধীনতার সঙ্গে জবাবদিহিও থাকতে হবে। ভুল সংবাদ হলে সংশোধন, অভিযোগের ক্ষেত্রে প্রমাণ, এবং অন্যায় হলে আত্মসমালোচনা—এসবকে সাংবাদিকতার সংস্কৃতির অংশ করতে হবে।
শেষ কথা
গণমাধ্যম কোনো রাজনৈতিক দল বা সরকারের মুখপাত্র নয়। আবার গণমাধ্যম জনগণের ওপরও কর্তৃত্ব করার প্রতিষ্ঠান নয়।
গণমাধ্যমের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো বিশ্বাসযোগ্যতা।
এই বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করা কঠিন, কিন্তু হারানো খুব সহজ। একটি মিথ্যা সংবাদ, একটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রতিবেদন কিংবা একটি যাচাইহীন তথ্য বছরের পর বছর ধরে তৈরি করা আস্থা নষ্ট করে দিতে পারে।
তাই বাংলাদেশের গণমাধ্যমের সামনে আজ সবচেয়ে বড় প্রয়োজন—স্বাধীনতার সঙ্গে দায়িত্ব, সাহসের সঙ্গে সত্যনিষ্ঠা এবং মতের সঙ্গে তথ্যের ভারসাম্য।
রাষ্ট্রকে নিশ্চিত করতে হবে সাংবাদিকরা যেন ভয়মুক্ত পরিবেশে কাজ করতে পারেন। আর সাংবাদিক সমাজকে নিশ্চিত করতে হবে—সেই স্বাধীনতার সর্বোত্তম ব্যবহার হবে জনগণের জানার অধিকার রক্ষায়।
কারণ শক্তিশালী গণমাধ্যম মানে শুধু শক্তিশালী সংবাদ প্রতিষ্ঠান নয়; শক্তিশালী গণমাধ্যম মানে আরও সচেতন নাগরিক, আরও জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান এবং একটি অধিকতর দায়িত্বশীল গণতান্ত্রিক সমাজ।—সম্পাদকীয় বিভাগ
TV26 News

বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৪ অক্টোবর ২০২৬
একটি রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক চরিত্র কতটা শক্তিশালী, তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সূচক হলো সেই দেশের গণমাধ্যম কতটা স্বাধীনভাবে সত্য ও জনস্বার্থের কথা বলতে পারে। কারণ গণমাধ্যম শুধু খবর প্রকাশ করে না—এটি রাষ্ট্রের কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণ করে, জনগণের প্রশ্ন সামনে আনে এবং ক্ষমতাসীনদের জবাবদিহির আওতায় রাখে।
বাংলাদেশেও গণমাধ্যমের সেই দায়িত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্বাধীনতার পর থেকে সংবাদপত্র, টেলিভিশন, রেডিও এবং বর্তমানে অনলাইন নিউজ পোর্টাল—সব মাধ্যমই সমাজের নানা ঘটনা ও সংকট জনগণের সামনে তুলে ধরেছে। দুর্নীতি, অনিয়ম, মানবাধিকার, জনদুর্ভোগ, রাজনৈতিক সংঘাত, প্রশাসনিক ব্যর্থতা কিংবা সামাজিক বৈষম্য—অনেক ক্ষেত্রেই গণমাধ্যমের প্রতিবেদন জনআলোচনার সূচনা করেছে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো—আজকের বাংলাদেশে গণমাধ্যম কি যথেষ্ট স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছে? আর স্বাধীনতার পাশাপাশি সংবাদমাধ্যম কি তার নিজস্ব পেশাগত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করছে?
স্বাধীনতা শুধু অধিকার নয়, দায়িত্বও
গণমাধ্যমের স্বাধীনতা গণতন্ত্রের অন্যতম ভিত্তি। একজন সাংবাদিক যেন ভয়, চাপ বা প্রতিশোধের আশঙ্কা ছাড়াই সত্য তথ্য অনুসন্ধান ও প্রকাশ করতে পারেন—এমন পরিবেশ নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
তবে স্বাধীনতা মানে যা খুশি তা প্রকাশ করা নয়। সংবাদ প্রকাশের সঙ্গে যুক্ত থাকে সত্যতা যাচাই, নৈতিকতা, ব্যক্তির মর্যাদা, জনস্বার্থ এবং আইনের প্রতি সম্মান।
কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রকাশের আগে তথ্য-প্রমাণ যাচাই করা, অভিযুক্ত পক্ষের বক্তব্য নেওয়া এবং অভিযোগকে প্রমাণিত সত্য হিসেবে উপস্থাপন না করা সাংবাদিকতার মৌলিক দায়িত্ব।
স্বাধীন সাংবাদিকতা যেমন প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা।
ক্ষমতার সামনে প্রশ্ন করাই সাংবাদিকতার অন্যতম দায়িত্ব
গণমাধ্যমের কাজ সরকারের প্রশংসা করা নয়, আবার বিরোধিতা করাও নয়। গণমাধ্যমের মূল দায়িত্ব হলো—যেখানে প্রশ্ন আছে, সেখানে প্রশ্ন করা; যেখানে অনিয়মের অভিযোগ আছে, সেখানে তথ্য অনুসন্ধান করা; আর যেখানে জনগণের স্বার্থ জড়িত, সেখানে জনগণের কণ্ঠ তুলে ধরা।
ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল, বিরোধী দল, প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, ব্যবসায়ী গোষ্ঠী কিংবা অন্য কোনো প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠান—কেউই সাংবাদিকতার প্রশ্নের ঊর্ধ্বে থাকা উচিত নয়।
একই মানদণ্ড সবার জন্য প্রয়োগ করতে না পারলে সংবাদমাধ্যমের নিরপেক্ষতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
সাংবাদিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি
একজন সাংবাদিক যখন মাঠে গিয়ে সংবাদ সংগ্রহ করেন, তখন তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শুধু সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যমের দায়িত্ব নয়; এটি রাষ্ট্র ও সমাজেরও দায়িত্ব।
সাংবাদিকের ওপর হামলা, ভয়ভীতি, হুমকি, হয়রানি কিংবা সংবাদ প্রকাশের কারণে প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের অভিযোগগুলো গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।
কারণ একজন সাংবাদিককে ভয় দেখানো মানে শুধু একজন ব্যক্তিকে চুপ করিয়ে দেওয়া নয়—এর ফলে একটি ঘটনা সম্পর্কে জনগণের জানার অধিকারও বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
ডিজিটাল যুগে গুজব ও অপতথ্যের চ্যালেঞ্জ
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনলাইন নিউজ পোর্টালের বিস্তারের ফলে সংবাদ এখন মানুষের হাতে পৌঁছায় কয়েক সেকেন্ডে। এটি যেমন গণমাধ্যমকে শক্তিশালী করেছে, তেমনি তৈরি করেছে নতুন ঝুঁকি।
যাচাইহীন তথ্য, ভুয়া খবর, পুরোনো ছবি দিয়ে নতুন ঘটনার বিভ্রান্তিকর উপস্থাপন, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত শিরোনাম এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের গুজব—এসব মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে পারে।
তাই ‘সবার আগে সংবাদ’ দেওয়ার প্রতিযোগিতার চেয়ে ‘সঠিক সংবাদ’ দেওয়ার প্রতিযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ।
একটি সংবাদ কয়েক মিনিট দেরিতে প্রকাশিত হলে তার ক্ষতি সীমিত হতে পারে; কিন্তু ভুল সংবাদ হাজার মানুষের কাছে পৌঁছে গেলে তার সামাজিক ক্ষতি অনেক বড় হতে পারে।
সংবাদমাধ্যমের নিজেদেরও আত্মসমালোচনা প্রয়োজন
গণমাধ্যমের স্বাধীনতার কথা বলার পাশাপাশি গণমাধ্যমের নিজের ভুল ও সীমাবদ্ধতা নিয়েও আলোচনা হওয়া দরকার।
ক্লিক ও ভিউ বাড়ানোর জন্য অতিরঞ্জিত শিরোনাম, যাচাইহীন তথ্য, একপাক্ষিক বক্তব্য, রাজনৈতিক পক্ষপাত কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টকে সরাসরি সংবাদ হিসেবে প্রকাশ—এসব সাংবাদিকতার মানকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
একটি প্রতিষ্ঠানের রাজনৈতিক বা বাণিজ্যিক স্বার্থ যদি সংবাদ নির্বাচনে প্রভাব ফেলে, তাহলে পাঠকের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
তাই গণমাধ্যমকে নিয়মিতভাবে নিজেদের প্রশ্ন করতে হবে—
আমরা কি সত্য প্রকাশ করছি?
আমরা কি সব পক্ষের বক্তব্য নিচ্ছি?
আমরা কি জনস্বার্থকে অগ্রাধিকার দিচ্ছি?
আমরা কি ভুল হলে তা স্বীকার করছি?
এই আত্মজিজ্ঞাসাই দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার ভিত্তি।
মতের পার্থক্য থাকবে, সত্যের মানদণ্ড এক হওয়া উচিত
বাংলাদেশ একটি বহুমতের সমাজ। রাজনৈতিক মতাদর্শ, সামাজিক অবস্থান ও দৃষ্টিভঙ্গিতে মানুষের মধ্যে পার্থক্য থাকবেই। গণমাধ্যমের কাজ সেই মতপার্থক্যকে আরও সংঘাতপূর্ণ করা নয়; বরং তথ্য ও যুক্তির ভিত্তিতে জনগণের সামনে বিভিন্ন মত তুলে ধরা।
বিশেষ করে রাজনৈতিক সংঘাত, সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা, পার্বত্য অঞ্চল, মানবাধিকার কিংবা জাতীয় নিরাপত্তার মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে সাংবাদিকদের আরও সতর্ক হতে হবে।
কারও বক্তব্য প্রকাশ করা এবং সেই বক্তব্যকে সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা—দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। সংবাদে এই পার্থক্য স্পষ্ট থাকা জরুরি।
প্রয়োজন স্বাধীন, পেশাদার ও জবাবদিহিমূলক গণমাধ্যম
বাংলাদেশের গণমাধ্যমকে শক্তিশালী করতে হলে একই সঙ্গে কয়েকটি বিষয় নিশ্চিত করা প্রয়োজন—সাংবাদিকদের নিরাপত্তা, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা, তথ্যপ্রাপ্তির সুযোগ, পেশাগত প্রশিক্ষণ, সম্পাদকীয় স্বাধীনতা এবং সাংবাদিকতার নৈতিক মানদণ্ড।
একই সঙ্গে গণমাধ্যমের ওপর অযাচিত রাজনৈতিক বা বাণিজ্যিক চাপ কমাতে হবে। সাংবাদিকের কলম যেন ভয় বা স্বার্থের কাছে বন্দি না হয়—এটাই হওয়া উচিত গণতান্ত্রিক সমাজের প্রত্যাশা।
তবে গণমাধ্যমের স্বাধীনতার সঙ্গে জবাবদিহিও থাকতে হবে। ভুল সংবাদ হলে সংশোধন, অভিযোগের ক্ষেত্রে প্রমাণ, এবং অন্যায় হলে আত্মসমালোচনা—এসবকে সাংবাদিকতার সংস্কৃতির অংশ করতে হবে।
শেষ কথা
গণমাধ্যম কোনো রাজনৈতিক দল বা সরকারের মুখপাত্র নয়। আবার গণমাধ্যম জনগণের ওপরও কর্তৃত্ব করার প্রতিষ্ঠান নয়।
গণমাধ্যমের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো বিশ্বাসযোগ্যতা।
এই বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করা কঠিন, কিন্তু হারানো খুব সহজ। একটি মিথ্যা সংবাদ, একটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রতিবেদন কিংবা একটি যাচাইহীন তথ্য বছরের পর বছর ধরে তৈরি করা আস্থা নষ্ট করে দিতে পারে।
তাই বাংলাদেশের গণমাধ্যমের সামনে আজ সবচেয়ে বড় প্রয়োজন—স্বাধীনতার সঙ্গে দায়িত্ব, সাহসের সঙ্গে সত্যনিষ্ঠা এবং মতের সঙ্গে তথ্যের ভারসাম্য।
রাষ্ট্রকে নিশ্চিত করতে হবে সাংবাদিকরা যেন ভয়মুক্ত পরিবেশে কাজ করতে পারেন। আর সাংবাদিক সমাজকে নিশ্চিত করতে হবে—সেই স্বাধীনতার সর্বোত্তম ব্যবহার হবে জনগণের জানার অধিকার রক্ষায়।
কারণ শক্তিশালী গণমাধ্যম মানে শুধু শক্তিশালী সংবাদ প্রতিষ্ঠান নয়; শক্তিশালী গণমাধ্যম মানে আরও সচেতন নাগরিক, আরও জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান এবং একটি অধিকতর দায়িত্বশীল গণতান্ত্রিক সমাজ।—সম্পাদকীয় বিভাগ
TV26 News

আপনার মতামত লিখুন