সারাদেশে প্রতিনিধি নিয়োগ দিচ্ছে ফোরকানুল হক (সাকিব) সম্পাদিত " TV 26 NEWS " আগ্রহীরা দ্রুত যোগাযোগ করুন। সব খবর সবার আগে পেতে আমাদের সাথেই থাকুন। পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশ খাইবার পাখতুনখাওয়ার (কেপি) সরাসরি নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে দেশটির কেন্দ্রীয় সরকার। এত দিন প্রদেশটির সরকার চালাচ্ছিল দেশটির কারাবন্দী সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই)।
প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের পরামর্শে প্রেসিডেন্ট আসিফ আলী জারদারি গত রোববার একটি ঘোষণাপত্রে সই করেন। এর মাধ্যমে খাইবার পাখতুনখাওয়ায় জরুরি অবস্থা জারি করা হয়। একই সঙ্গে বলা হয়, প্রাদেশিক সরকার সংবিধান অনুযায়ী কার্যক্রম আর পরিচালনা করতে পারছে না। এই ঘোষণা গভর্নর তথা কেন্দ্রীয় শাসন জারির আইনি ভিত্তি তৈরি করে।
গতকাল সোমবার পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী তালাল চৌধুরী জানান, প্রদেশটির মুখ্যমন্ত্রী সোহেল আফ্রিদিকে আটক করা হয়েছে।
আগের দিন রোববার আইনমন্ত্রী আজম নাজির তারার ইসলামাবাদে সংবাদ সম্মেলনে বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াই এবং সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের ভয়াবহ পরিণতি থেকে নিরীহ মানুষকে রক্ষা করার জন্যই মূলত জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছে।
খাইবার পাখতুনখাওয়ায় ২০১৩ সাল থেকে ক্ষমতায় রয়েছে পিটিআই। দলটি সেখানে জরুরি অবস্থা ও কেন্দ্রীয় সরকারের শাসন জারির সিদ্ধান্ত প্রত্যাখ্যান করেছে।
ইমরান খানের মুক্তির দাবিতে ইসলামাবাদ অভিমুখে পদযাত্রার পরিকল্পনা নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকার ও পিটিআইয়ের আলোচনা ভেঙে পড়ার পর প্রদেশটিতে এসব পরিবর্তন আসে। এখন প্রশ্ন হলো, প্রদেশটি কে পরিচালনা করবেন? জরুরি অবস্থা ও গভর্নর শাসনের অর্থ কী, আর এ ব্যবস্থা কত দিন চলতে পারে?
কেন্দ্রীয় সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, খাইবার পাখতুনখাওয়ার গভর্নর ফয়সাল করিম কুন্ডি এখন প্রাদেশিক সরকারের দায়িত্ব পালন করবেন। কুন্ডি পাকিস্তান পিপলস পার্টির (পিপিপি) নেতা। দলটি শাহবাজ শরিফের কেন্দ্রীয় সরকারের মিত্র।
প্রাদেশিক পরিষদের ক্ষমতাও এখন পাকিস্তানের পার্লামেন্টের হাতে যাবে। পার্লামেন্টে শাহবাজের পাকিস্তান মুসলিম লীগ-নওয়াজ (পিএমএল-এন), পিপিপি ও তাদের মিত্ররা সংখ্যাগরিষ্ঠ। অন্যদিকে খাইবার পাখতুনখাওয়ার প্রাদেশিক পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠ পিটিআই।
সরকারি ঘোষণায় বলা হয়েছে, মুখ্যমন্ত্রী, মন্ত্রী, উপদেষ্টা, বিশেষ সহকারী ও অ্যাডভোকেট জেনারেল অবিলম্বে পদে থেকে সরে দাঁড়াবেন।
তবে লাহোরের আইনজীবী ও লাহোর ইউনিভার্সিটি অব ম্যানেজমেন্ট সায়েন্সেসের (লামস) খণ্ডকালীন শিক্ষক হাসান আবদুল্লাহ নিয়াজি বিষয়টির ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তিনি আল–জাজিরাকে বলেন, এর অর্থ এই নয় যে খাইবার পাখতুনখাওয়ার প্রাদেশিক পরিষদ বা নির্বাচিত মুখ্যমন্ত্রীকে স্থায়ীভাবে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
আবদুল্লাহ নিয়াজির ভাষায়, ‘বরং ধরে নেওয়া যায়, জরুরি অবস্থা প্রত্যাহার না হওয়া পর্যন্ত তাঁরা কার্যত নিষ্ক্রিয় থাকবেন। জরুরি অবস্থা উঠে গেলে তাঁদের আবার দায়িত্বে ফিরিয়ে আনতে হবে।’
গভর্নর কুন্ডিকে সহায়তা করবে ১১ সদস্যের একটি উপদেষ্টা পরিষদ। প্রদেশটিতে সেনাবাহিনী আগে থেকে মোতায়েন রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সেনাবাহিনী গভর্নর ও তাঁর দলকে সহায়তা করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
কেন্দ্রীয় সরকারের আরেকটি আদেশে খাইবার পাখতুনখাওয়ার ১২টি ‘নির্ধারিত জেলার’ জন্য আলাদা সচিবালয় গঠন করা হয়েছে। এসব জেলার বেশির ভাগই আফগান সীমান্তসংলগ্ন সাবেক উপজাতীয় এলাকায়।
এই সচিবালয়ের নেতৃত্ব দেবেন একজন অতিরিক্ত মুখ্য সচিব। তাঁর আদেশ প্রাদেশিক সরকারের আদেশের সমান আইনি কার্যকারিতা পাবে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নাকভি বলেছেন, এর অর্থ প্রদেশ ভাগ করা নয়। তাঁর ভাষায়, এগুলো যুদ্ধবিধ্বস্ত জেলা। এসব এলাকায় এখন বেশি অর্থায়ন ও মনোযোগ প্রয়োজন। সে কারণে আলাদা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
সরকারি আদেশে আরও বলা হয়েছে, বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে আলাদা রাখার যে সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা রয়েছে, তা এই ১২ জেলায় কার্যকর হবে না।
লাহোরের সাংবিধানিক আইনজীবী রিদা হোসাইন আল–জাজিরাকে বলেন, এর ফলে নির্বাহী কর্মকর্তারা বিচারিক দায়িত্বও পালন করতে পারবেন।
পাকিস্তানের সংবিধানের ২৩২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো প্রাদেশিক সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে গিয়ে অভ্যন্তরীণ গোলযোগে নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়লে প্রেসিডেন্ট জরুরি অবস্থা জারি করতে পারেন। অন্যদিকে যখন কোনো গভর্নর জানান—কোনো প্রদেশ সংবিধান অনুযায়ী পরিচালনা করা সম্ভব হচ্ছে না, ২৩৪ অনুচ্ছেদ প্রযোজ্য হয়।
সরকারি ঘোষণায় বলা হয়েছে, খাইবার পাখতুনখাওয়ায় ‘নজিরবিহীন মাত্রার সহিংস’ সন্ত্রাসী হামলা হয়েছে। প্রাদেশিক সরকার সন্ত্রাস মোকাবিলায় যথেষ্ট দায়বদ্ধতা, সদিচ্ছা ও আগ্রহ দেখাতে ব্যর্থ হয়েছে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।
ইসলামাবাদভিত্তিক স্বাধীন গবেষণাপ্রতিষ্ঠান পাকিস্তান ইনস্টিটিউট ফর কনফ্লিক্ট অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজের (পিআইসিএসএস) হিসাবমতে, ২০২৫ সালে পাকিস্তানে অন্তত ১ হাজার ৬৬টি সশস্ত্র হামলা হয়েছিল। ২০২৪ সালে এ সংখ্যা ছিল ৯০৮।
২০২৬ সালে হামলার সংখ্যা আরও বেড়েছে। চলতি বছরের প্রথম ৯ মাসেই দেশজুড়ে ১ হাজার ২৩২টি হামলার তথ্য নথিভুক্ত করেছে প্রতিষ্ঠানটি। এসব হামলার বেশির ভাগই ঘটেছে খাইবার পাখতুনখাওয়া ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় বেলুচিস্তান প্রদেশে।
আইনমন্ত্রী তারার বলেন, পরিস্থিতি এতটাই গুরুতর ও ব্যতিক্রমী ছিল যে যার ফলে সংবিধানের দুই ধারাই একসঙ্গে প্রয়োগ করা হয়েছে।
তথ্যমন্ত্রী আতাউল্লাহ তারার আরও কঠোর অভিযোগ করেছেন। তাঁর দাবি, খাইবার পাখতুনখাওয়ার পিটিআই সরকার সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে যোগসাজশে রয়েছে।
তারারের ভাষ্য, মন্ত্রিসভার সদস্যরা বিবেচনা করেই এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন। কিন্তু তাঁর এই অভিযোগের পক্ষে কোনো প্রমাণ দেওয়া হয়নি।
তবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নাকভি বলেছেন, প্রাদেশিক সরকারের বিরুদ্ধে কেন্দ্রের কাছে বেশ কিছু প্রমাণ রয়েছে।
ইসলামাবাদে এক সংবাদ সম্মেলনে পিটিআই চেয়ারম্যান গওহর আলী খান প্রশ্ন তুলেছেন, ‘যদি ১২টি জেলায় সন্ত্রাসবাদ থাকে এবং সেখানে জরুরি অবস্থা প্রয়োজন হয়, তাহলে পুরো প্রদেশে গভর্নর শাসন কেন?’
পিটিআই নেতা ও সাবেক প্রাদেশিক অর্থমন্ত্রী তৈমুর ঝাগড়া সরকারের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন।
প্রাদেশিক সরকার সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করছিল উল্লেখ করে তৈমুর ঝাগড়া আল–জাজিরাকে বলেন, ‘আমরা ব্যক্তিগত ও সম্মিলিতভাবে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের দায় নিই। যদি মূল সমস্যা সন্ত্রাসবাদই হয়, তাহলে খাইবার পাখতুনখাওয়ার আগে বেলুচিস্তানে জরুরি অবস্থা জারি হওয়ার কথা ছিল।’
পিটিআই জানিয়েছে, গত রোববার পর্যন্ত মুখ্যমন্ত্রী থাকা সোহেল আফ্রিদি এবং দলের আরও কয়েকজন নেতা আটক রয়েছেন।
তৈমুর ঝাগড়া বলেন, ‘আমরা জানি যে মুখ্যমন্ত্রী, প্রাদেশিক পিটিআই সভাপতি জুনাইদ আকবর, স্পিকার বাবর সোয়াতি এবং আরও কয়েকজন নেতাকে আটক করা হয়েছে। কিন্তু তাঁদের কোথায় রাখা হয়েছে, সরকার তা জানায়নি।’
একই দিন পিটিআই নেতাদের আটক করা হতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নাকভি। তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে যাঁদের প্রয়োজন হবে, তাঁদের ‘প্রতিরোধমূলক হেফাজতে’ (অপরাধ করার আগেই আইনশৃঙ্খলার স্বার্থে সাময়িক আটক) নেওয়া হবে। যাঁদের বিরুদ্ধে মামলা বা গ্রেপ্তারি পরোয়ানা রয়েছে, তাঁদের গ্রেপ্তার করা হবে। অন্যদের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে ছেড়ে দেওয়া হবে।
পরে আইনমন্ত্রী তারার জানান, কয়েকজন পিটিআই নেতাকে ইতিমধ্যে প্রতিরোধমূলক হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। পিটিআই বলছে, রোববারের আগেই কয়েকজন প্রাদেশিক মন্ত্রী ও আইনপ্রণেতাকে আটক করা হয়েছিল।
ইন্টারনেট পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান নেটব্লকস ওই রাতে জানায়, প্রদেশের কয়েকটি এলাকায় ইন্টারনেট সংযোগে বড় ধরনের বিঘ্ন দেখা গেছে। গতকাল সোমবার পেশোয়ার, মারদান, সোয়াবি ও নওশেরায় স্কুল-কলেজ বন্ধ রাখে স্থানীয় প্রশাসন।
এদিকে পাঞ্জাব প্রদেশে ইমরান খানের তিন বোন আলিমা খান, উজমা খান ও নওরিন নিয়াজি ২০-২১ সেপ্টেম্বর থেকে হেফাজতে রয়েছেন। জনশৃঙ্খলাসংক্রান্ত একটি আইনের অধীনে তাঁদের আটক করা হয়েছে। ওই আইনে কাউকে ৩০ দিন পর্যন্ত প্রতিরোধমূলক হেফাজতে রাখা যায়।
পাকিস্তানের বিভিন্ন প্রদেশে ১৯৪৯ সালের পর অন্তত আটবার গভর্নর শাসন জারি হয়েছে।
বর্তমান খাইবার পাখতুনখাওয়ায় ১৯৭৫ ও ১৯৯৪ সালেও কেন্দ্রীয় (গভর্নর) শাসন জারি করা হয়েছিল। এটি আগে নর্থ ওয়েস্ট ফ্রন্টিয়ার প্রভিন্স নামে পরিচিত ছিল।
এবার প্রেসিডেন্ট জারদারি প্রাদেশিক পরিষদের কোনো প্রস্তাব ছাড়াই জরুরি অবস্থা জারি করেছেন। তাই সংবিধান অনুযায়ী, ১০ দিনের মধ্যে পাকিস্তানের পার্লামেন্টের দুই কক্ষকে এই সিদ্ধান্ত অনুমোদন করতে হবে। অর্থাৎ ২১ অক্টোবরের মধ্যে অনুমোদন প্রয়োজন।
আজ মঙ্গলবার জাতীয় পরিষদ ও সিনেটের অধিবেশন ডাকা হয়েছে। জরুরি অবস্থার ঘোষণাটি ৩০ দিনের মধ্যে পার্লামেন্টের যৌথ অধিবেশনে তুলতে হবে। যৌথ অধিবেশনের অনুমোদন না পেলে দুই মাস পর জরুরি অবস্থার মেয়াদ শেষ হয়ে যাবে।
কিন্তু জরুরি অবস্থা একবার অনুমোদিত হলে, তা কবে শেষ হবে সংবিধানে সেটা সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ নেই। এটি প্রত্যাহার না করা পর্যন্ত বহাল থাকতে পারে। আবার পার্লামেন্টের দুই কক্ষের মোট সদস্যের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ এর বিরোধিতা করলেও তা বাতিল হতে পারে।
অন্যদিকে সংবিধানের ২৩৪ অনুচ্ছেদের অধীনে গভর্নর শাসনের সময়সীমা আলাদা। পার্লামেন্ট দুই মাস করে এর মেয়াদ বাড়াতে পারে। তবে সব মিলিয়ে সর্বোচ্চ ছয় মাস গভর্নর শাসন চলতে পারে।
সাংবিধানিক আইনজীবী রিদা হোসাইন বলেন, জরুরি অবস্থার বিধানে সরকার কিছু মৌলিক অধিকার স্থগিত করতে পারে। আর জরুরি অবস্থার কোনো নির্দিষ্ট সর্বোচ্চ সময়সীমা না থাকায় কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ দীর্ঘায়িত হওয়ার সুযোগ রয়েছে।
পিটিআই চেয়ারম্যান গওহর আলী খান বলেছেন, জরুরি অবস্থা ও গভর্নর শাসনের সিদ্ধান্ত আদালত ও আইনসভায় চ্যালেঞ্জ করবে তাঁর দল। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতেও ইসলামাবাদ অভিমুখে দলের পরিকল্পিত লংমার্চ আনুষ্ঠানিকভাবে বাতিল করা হয়নি।
গওহর বলেন, ‘আমরা আনুষ্ঠানিকভাবে লংমার্চ বাতিল করিনি। আমাদের লড়াই অবশ্যই চলবে।’
বিষয় : পাকিস্তান সরকার জরুরি অবস্থা

মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৩ অক্টোবর ২০২৬
পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশ খাইবার পাখতুনখাওয়ার (কেপি) সরাসরি নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে দেশটির কেন্দ্রীয় সরকার। এত দিন প্রদেশটির সরকার চালাচ্ছিল দেশটির কারাবন্দী সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই)।
প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের পরামর্শে প্রেসিডেন্ট আসিফ আলী জারদারি গত রোববার একটি ঘোষণাপত্রে সই করেন। এর মাধ্যমে খাইবার পাখতুনখাওয়ায় জরুরি অবস্থা জারি করা হয়। একই সঙ্গে বলা হয়, প্রাদেশিক সরকার সংবিধান অনুযায়ী কার্যক্রম আর পরিচালনা করতে পারছে না। এই ঘোষণা গভর্নর তথা কেন্দ্রীয় শাসন জারির আইনি ভিত্তি তৈরি করে।
গতকাল সোমবার পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী তালাল চৌধুরী জানান, প্রদেশটির মুখ্যমন্ত্রী সোহেল আফ্রিদিকে আটক করা হয়েছে।
আগের দিন রোববার আইনমন্ত্রী আজম নাজির তারার ইসলামাবাদে সংবাদ সম্মেলনে বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াই এবং সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের ভয়াবহ পরিণতি থেকে নিরীহ মানুষকে রক্ষা করার জন্যই মূলত জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছে।
খাইবার পাখতুনখাওয়ায় ২০১৩ সাল থেকে ক্ষমতায় রয়েছে পিটিআই। দলটি সেখানে জরুরি অবস্থা ও কেন্দ্রীয় সরকারের শাসন জারির সিদ্ধান্ত প্রত্যাখ্যান করেছে।
ইমরান খানের মুক্তির দাবিতে ইসলামাবাদ অভিমুখে পদযাত্রার পরিকল্পনা নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকার ও পিটিআইয়ের আলোচনা ভেঙে পড়ার পর প্রদেশটিতে এসব পরিবর্তন আসে। এখন প্রশ্ন হলো, প্রদেশটি কে পরিচালনা করবেন? জরুরি অবস্থা ও গভর্নর শাসনের অর্থ কী, আর এ ব্যবস্থা কত দিন চলতে পারে?
কেন্দ্রীয় সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, খাইবার পাখতুনখাওয়ার গভর্নর ফয়সাল করিম কুন্ডি এখন প্রাদেশিক সরকারের দায়িত্ব পালন করবেন। কুন্ডি পাকিস্তান পিপলস পার্টির (পিপিপি) নেতা। দলটি শাহবাজ শরিফের কেন্দ্রীয় সরকারের মিত্র।
প্রাদেশিক পরিষদের ক্ষমতাও এখন পাকিস্তানের পার্লামেন্টের হাতে যাবে। পার্লামেন্টে শাহবাজের পাকিস্তান মুসলিম লীগ-নওয়াজ (পিএমএল-এন), পিপিপি ও তাদের মিত্ররা সংখ্যাগরিষ্ঠ। অন্যদিকে খাইবার পাখতুনখাওয়ার প্রাদেশিক পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠ পিটিআই।
সরকারি ঘোষণায় বলা হয়েছে, মুখ্যমন্ত্রী, মন্ত্রী, উপদেষ্টা, বিশেষ সহকারী ও অ্যাডভোকেট জেনারেল অবিলম্বে পদে থেকে সরে দাঁড়াবেন।
তবে লাহোরের আইনজীবী ও লাহোর ইউনিভার্সিটি অব ম্যানেজমেন্ট সায়েন্সেসের (লামস) খণ্ডকালীন শিক্ষক হাসান আবদুল্লাহ নিয়াজি বিষয়টির ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তিনি আল–জাজিরাকে বলেন, এর অর্থ এই নয় যে খাইবার পাখতুনখাওয়ার প্রাদেশিক পরিষদ বা নির্বাচিত মুখ্যমন্ত্রীকে স্থায়ীভাবে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
আবদুল্লাহ নিয়াজির ভাষায়, ‘বরং ধরে নেওয়া যায়, জরুরি অবস্থা প্রত্যাহার না হওয়া পর্যন্ত তাঁরা কার্যত নিষ্ক্রিয় থাকবেন। জরুরি অবস্থা উঠে গেলে তাঁদের আবার দায়িত্বে ফিরিয়ে আনতে হবে।’
গভর্নর কুন্ডিকে সহায়তা করবে ১১ সদস্যের একটি উপদেষ্টা পরিষদ। প্রদেশটিতে সেনাবাহিনী আগে থেকে মোতায়েন রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সেনাবাহিনী গভর্নর ও তাঁর দলকে সহায়তা করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
কেন্দ্রীয় সরকারের আরেকটি আদেশে খাইবার পাখতুনখাওয়ার ১২টি ‘নির্ধারিত জেলার’ জন্য আলাদা সচিবালয় গঠন করা হয়েছে। এসব জেলার বেশির ভাগই আফগান সীমান্তসংলগ্ন সাবেক উপজাতীয় এলাকায়।
এই সচিবালয়ের নেতৃত্ব দেবেন একজন অতিরিক্ত মুখ্য সচিব। তাঁর আদেশ প্রাদেশিক সরকারের আদেশের সমান আইনি কার্যকারিতা পাবে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নাকভি বলেছেন, এর অর্থ প্রদেশ ভাগ করা নয়। তাঁর ভাষায়, এগুলো যুদ্ধবিধ্বস্ত জেলা। এসব এলাকায় এখন বেশি অর্থায়ন ও মনোযোগ প্রয়োজন। সে কারণে আলাদা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
সরকারি আদেশে আরও বলা হয়েছে, বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে আলাদা রাখার যে সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা রয়েছে, তা এই ১২ জেলায় কার্যকর হবে না।
লাহোরের সাংবিধানিক আইনজীবী রিদা হোসাইন আল–জাজিরাকে বলেন, এর ফলে নির্বাহী কর্মকর্তারা বিচারিক দায়িত্বও পালন করতে পারবেন।
পাকিস্তানের সংবিধানের ২৩২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো প্রাদেশিক সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে গিয়ে অভ্যন্তরীণ গোলযোগে নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়লে প্রেসিডেন্ট জরুরি অবস্থা জারি করতে পারেন। অন্যদিকে যখন কোনো গভর্নর জানান—কোনো প্রদেশ সংবিধান অনুযায়ী পরিচালনা করা সম্ভব হচ্ছে না, ২৩৪ অনুচ্ছেদ প্রযোজ্য হয়।
সরকারি ঘোষণায় বলা হয়েছে, খাইবার পাখতুনখাওয়ায় ‘নজিরবিহীন মাত্রার সহিংস’ সন্ত্রাসী হামলা হয়েছে। প্রাদেশিক সরকার সন্ত্রাস মোকাবিলায় যথেষ্ট দায়বদ্ধতা, সদিচ্ছা ও আগ্রহ দেখাতে ব্যর্থ হয়েছে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।
ইসলামাবাদভিত্তিক স্বাধীন গবেষণাপ্রতিষ্ঠান পাকিস্তান ইনস্টিটিউট ফর কনফ্লিক্ট অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজের (পিআইসিএসএস) হিসাবমতে, ২০২৫ সালে পাকিস্তানে অন্তত ১ হাজার ৬৬টি সশস্ত্র হামলা হয়েছিল। ২০২৪ সালে এ সংখ্যা ছিল ৯০৮।
২০২৬ সালে হামলার সংখ্যা আরও বেড়েছে। চলতি বছরের প্রথম ৯ মাসেই দেশজুড়ে ১ হাজার ২৩২টি হামলার তথ্য নথিভুক্ত করেছে প্রতিষ্ঠানটি। এসব হামলার বেশির ভাগই ঘটেছে খাইবার পাখতুনখাওয়া ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় বেলুচিস্তান প্রদেশে।
আইনমন্ত্রী তারার বলেন, পরিস্থিতি এতটাই গুরুতর ও ব্যতিক্রমী ছিল যে যার ফলে সংবিধানের দুই ধারাই একসঙ্গে প্রয়োগ করা হয়েছে।
তথ্যমন্ত্রী আতাউল্লাহ তারার আরও কঠোর অভিযোগ করেছেন। তাঁর দাবি, খাইবার পাখতুনখাওয়ার পিটিআই সরকার সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে যোগসাজশে রয়েছে।
তারারের ভাষ্য, মন্ত্রিসভার সদস্যরা বিবেচনা করেই এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন। কিন্তু তাঁর এই অভিযোগের পক্ষে কোনো প্রমাণ দেওয়া হয়নি।
তবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নাকভি বলেছেন, প্রাদেশিক সরকারের বিরুদ্ধে কেন্দ্রের কাছে বেশ কিছু প্রমাণ রয়েছে।
ইসলামাবাদে এক সংবাদ সম্মেলনে পিটিআই চেয়ারম্যান গওহর আলী খান প্রশ্ন তুলেছেন, ‘যদি ১২টি জেলায় সন্ত্রাসবাদ থাকে এবং সেখানে জরুরি অবস্থা প্রয়োজন হয়, তাহলে পুরো প্রদেশে গভর্নর শাসন কেন?’
পিটিআই নেতা ও সাবেক প্রাদেশিক অর্থমন্ত্রী তৈমুর ঝাগড়া সরকারের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন।
প্রাদেশিক সরকার সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করছিল উল্লেখ করে তৈমুর ঝাগড়া আল–জাজিরাকে বলেন, ‘আমরা ব্যক্তিগত ও সম্মিলিতভাবে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের দায় নিই। যদি মূল সমস্যা সন্ত্রাসবাদই হয়, তাহলে খাইবার পাখতুনখাওয়ার আগে বেলুচিস্তানে জরুরি অবস্থা জারি হওয়ার কথা ছিল।’
পিটিআই জানিয়েছে, গত রোববার পর্যন্ত মুখ্যমন্ত্রী থাকা সোহেল আফ্রিদি এবং দলের আরও কয়েকজন নেতা আটক রয়েছেন।
তৈমুর ঝাগড়া বলেন, ‘আমরা জানি যে মুখ্যমন্ত্রী, প্রাদেশিক পিটিআই সভাপতি জুনাইদ আকবর, স্পিকার বাবর সোয়াতি এবং আরও কয়েকজন নেতাকে আটক করা হয়েছে। কিন্তু তাঁদের কোথায় রাখা হয়েছে, সরকার তা জানায়নি।’
একই দিন পিটিআই নেতাদের আটক করা হতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নাকভি। তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে যাঁদের প্রয়োজন হবে, তাঁদের ‘প্রতিরোধমূলক হেফাজতে’ (অপরাধ করার আগেই আইনশৃঙ্খলার স্বার্থে সাময়িক আটক) নেওয়া হবে। যাঁদের বিরুদ্ধে মামলা বা গ্রেপ্তারি পরোয়ানা রয়েছে, তাঁদের গ্রেপ্তার করা হবে। অন্যদের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে ছেড়ে দেওয়া হবে।
পরে আইনমন্ত্রী তারার জানান, কয়েকজন পিটিআই নেতাকে ইতিমধ্যে প্রতিরোধমূলক হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। পিটিআই বলছে, রোববারের আগেই কয়েকজন প্রাদেশিক মন্ত্রী ও আইনপ্রণেতাকে আটক করা হয়েছিল।
ইন্টারনেট পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান নেটব্লকস ওই রাতে জানায়, প্রদেশের কয়েকটি এলাকায় ইন্টারনেট সংযোগে বড় ধরনের বিঘ্ন দেখা গেছে। গতকাল সোমবার পেশোয়ার, মারদান, সোয়াবি ও নওশেরায় স্কুল-কলেজ বন্ধ রাখে স্থানীয় প্রশাসন।
এদিকে পাঞ্জাব প্রদেশে ইমরান খানের তিন বোন আলিমা খান, উজমা খান ও নওরিন নিয়াজি ২০-২১ সেপ্টেম্বর থেকে হেফাজতে রয়েছেন। জনশৃঙ্খলাসংক্রান্ত একটি আইনের অধীনে তাঁদের আটক করা হয়েছে। ওই আইনে কাউকে ৩০ দিন পর্যন্ত প্রতিরোধমূলক হেফাজতে রাখা যায়।
পাকিস্তানের বিভিন্ন প্রদেশে ১৯৪৯ সালের পর অন্তত আটবার গভর্নর শাসন জারি হয়েছে।
বর্তমান খাইবার পাখতুনখাওয়ায় ১৯৭৫ ও ১৯৯৪ সালেও কেন্দ্রীয় (গভর্নর) শাসন জারি করা হয়েছিল। এটি আগে নর্থ ওয়েস্ট ফ্রন্টিয়ার প্রভিন্স নামে পরিচিত ছিল।
এবার প্রেসিডেন্ট জারদারি প্রাদেশিক পরিষদের কোনো প্রস্তাব ছাড়াই জরুরি অবস্থা জারি করেছেন। তাই সংবিধান অনুযায়ী, ১০ দিনের মধ্যে পাকিস্তানের পার্লামেন্টের দুই কক্ষকে এই সিদ্ধান্ত অনুমোদন করতে হবে। অর্থাৎ ২১ অক্টোবরের মধ্যে অনুমোদন প্রয়োজন।
আজ মঙ্গলবার জাতীয় পরিষদ ও সিনেটের অধিবেশন ডাকা হয়েছে। জরুরি অবস্থার ঘোষণাটি ৩০ দিনের মধ্যে পার্লামেন্টের যৌথ অধিবেশনে তুলতে হবে। যৌথ অধিবেশনের অনুমোদন না পেলে দুই মাস পর জরুরি অবস্থার মেয়াদ শেষ হয়ে যাবে।
কিন্তু জরুরি অবস্থা একবার অনুমোদিত হলে, তা কবে শেষ হবে সংবিধানে সেটা সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ নেই। এটি প্রত্যাহার না করা পর্যন্ত বহাল থাকতে পারে। আবার পার্লামেন্টের দুই কক্ষের মোট সদস্যের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ এর বিরোধিতা করলেও তা বাতিল হতে পারে।
অন্যদিকে সংবিধানের ২৩৪ অনুচ্ছেদের অধীনে গভর্নর শাসনের সময়সীমা আলাদা। পার্লামেন্ট দুই মাস করে এর মেয়াদ বাড়াতে পারে। তবে সব মিলিয়ে সর্বোচ্চ ছয় মাস গভর্নর শাসন চলতে পারে।
সাংবিধানিক আইনজীবী রিদা হোসাইন বলেন, জরুরি অবস্থার বিধানে সরকার কিছু মৌলিক অধিকার স্থগিত করতে পারে। আর জরুরি অবস্থার কোনো নির্দিষ্ট সর্বোচ্চ সময়সীমা না থাকায় কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ দীর্ঘায়িত হওয়ার সুযোগ রয়েছে।
পিটিআই চেয়ারম্যান গওহর আলী খান বলেছেন, জরুরি অবস্থা ও গভর্নর শাসনের সিদ্ধান্ত আদালত ও আইনসভায় চ্যালেঞ্জ করবে তাঁর দল। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতেও ইসলামাবাদ অভিমুখে দলের পরিকল্পিত লংমার্চ আনুষ্ঠানিকভাবে বাতিল করা হয়নি।
গওহর বলেন, ‘আমরা আনুষ্ঠানিকভাবে লংমার্চ বাতিল করিনি। আমাদের লড়াই অবশ্যই চলবে।’

আপনার মতামত লিখুন